কাজী আবুল মনসুর#
ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতীয় নার্স নিমিষা প্রিয়া-কে আগামী ১৬ জুলাই ফাঁসি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইয়েমেন সরকার ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য এই তারিখ নির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী স্যামুয়েল জেরোম বাস্কারন, যিনি নিমিষার মা প্রেমা কুমারী-র পক্ষে ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ প্রাপ্ত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রকাশ, ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক স্তরে যোগাযোগ করে নিমিষার প্রাণরক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ভারতীয় দূতাবাসও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
কে এই নিমিষা প্রিয়া?
কেরালার পালাক্কাদ জেলার কোল্লেনগোড এলাকার বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী নিমিষা প্রিয়া ২০১৫ সালে নার্স হিসেবে কাজের জন্য ইয়েমেনে পাড়ি জমান। পরে তিনি সেখানে একটি ক্লিনিক খোলেন। ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদি তার ব্যবসায়িক সহযোগী ছিলেন। কিন্তু দুজনের মধ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। নিমিষার পরিবারের দাবি, মাহদি নিমিষার পাসপোর্ট জব্দ করে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এ থেকে মুক্তি পেতে নিমিষা ২০১৭ সালে মাহদির পানীয়তে ট্রাঙ্কুইলাইজার মেশান। কিন্তু ওভারডোজের ফলে মাহদির মৃত্যু হয়।
মাহদির পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ইয়েমেনের আদালত নিমিষাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১৮ সালে নিমিষা প্রিয়াকে স্থানীয় আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ২০২৩ সালে ইয়েমেনের সর্বোচ্চ আদালত নিমিষার আপিল খারিজ করে আগের রায় বহাল রাখে। ২০২৪ সালে ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন দেন।
ব্লাড মানি ও মধ্যস্থতার চেষ্টা
ইসলামী আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তের পরিবার হত্যাকারীর কাছ থেকে ‘দিয়্যাহ’ বা ব্লাড মানি গ্রহণ করলে শাস্তি মওকুফ করা যায়। মানবাধিকার কর্মী স্যামুয়েল জেরোম ও ‘Save Nimisha Priya Action Council’ মাহদির পরিবারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিমিষাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা প্রথম কিস্তির ব্লাড মানি হিসেবে ৪০,০০০ মার্কিন ডলার জোগাড় করেছেন। তবে মাহদির পরিবারের চাওয়া পুরো অর্থের ব্যবস্থা না হওয়ায় আলোচনা অনিশ্চিত অবস্থায় আছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন যৌথভাবে ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে:
“আমরা ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। নিমিষা প্রিয়ার প্রাণ বাঁচানোর জন্য সমস্ত কূটনৈতিক ও আইনি উপায় অনুসন্ধান করা হচ্ছে।”
মায়ের আকুতি
নিমিষার মা প্রেমা কুমারী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার মেয়ের জীবন এখন ইয়েমেন সরকারের হাতে। আমি ভারত সরকারের কাছে কাতর অনুরোধ করছি, আমার মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যা করা দরকার, তা করুন।”
মানবাধিকার সংগঠনের দাবি
‘Save Nimisha Priya Action Council’ এর দাবি, ব্লাড মানির বাকি অংশের জন্য আন্তর্জাতিক দাতাদের এগিয়ে আসা উচিত। তারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রবাসীদের সহায়তা কামনা করেছে।
আনন্দবাজার লিখেছে, ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার চরম দণ্ড কার্যকর করা হবে আগামী ১৬ জুলাই। নিমিশার মা প্রেমা কুমারীর ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’প্রাপ্ত মানবাধিকার কর্মী স্যামুয়েল জেরোম বলেন, ‘‘ইয়েমেন সরকার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন জানিয়ে দিয়েছে আমাদের।’’ বিদেশ মন্ত্রকের সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত একটি খবরে জানানো হয়েছে, কূটনৈতিক স্তরে যোগাযোগ করে নিমিশার প্রাণরক্ষার চেষ্টা চলছে।
কেরলের পালাক্কড় জেলার বাসিন্দা নিমিশা নার্সের কাজ নিয়ে ২০০৮ সালে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। স্বামী টমি থমাস এবং মেয়েকে নিয়ে ইয়েমেনে থাকতেন তিনি। ২০১৪ সালে তাঁর স্বামী এবং ১১ বছরের কন্যা ভারতে ফিরে এলেও নিমিশা ইয়েমেনেই থেকে গিয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল নিজের ক্লিনিক খুলবেন। ওই বছরই ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদির সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। মাহদি তাঁকে নতুন ক্লিনিক খুলতে সাহায্য করবেন বলে আশ্বাস দেন। কারণ, আইন অনুযায়ী, ইয়েমেনে নতুন ব্যবসা শুরু করতে গেলে দেশীয় অংশীদারের দরকার ছিল নিমিশার। সেই মতো ২০১৫ সালে দু’জন মিলে নতুন ক্লিনিক খোলেন। এর পর থেকেই শুরু হয় দুই অংশীদারের মতবিরোধ।
অভিযোগ, নিমিশার টাকা, পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছিলেন মাহদি। আইনি কাগজপত্রে নিমিশাকে নিজের স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেন মাহদি, ফলে নিমিশার প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়া জটিল হয়ে পড়ে। অভিযোগ, একাধিক বার পুলিশের দ্বারস্থ হলেও কোনও লাভ হয়নি। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই মাহদিকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেন ওই নার্স। নিমিশার দাবি, মাহদিকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের পাসপোর্ট পুনরুদ্ধার করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কিন্তু ওভারডোজ়ের কারণে মৃত্যু হয় মাহদির। এর পর হানান নামে এক সহকর্মীর সঙ্গে মিলে মাহদির দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে জলের ট্যাঙ্কে ফেলে দেন ওই নার্স। ওই মাসেই ইয়েমেন ছেড়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে যান নিমিশা।##

