কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
রাশিয়া ইরানকে অত্যাধুনিক ইস্কান্দার-এম (9K720 Iskander-M) ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক মিসাইল সরবরাহ করেছে—সম্প্রতি এমন দাবি করেছে ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি এবং দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যম। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো বা অন্য কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাও এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
তবে এই খবরটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, যদি সত্যিই ইরান ইস্কান্দার-এম পেয়ে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ইস্কান্দার-এম কী?
ইস্কান্দার-এম রাশিয়ার তৈরি একটি Short-Range Ballistic Missile (SRBM) বা স্বল্প-পাল্লার ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। ন্যাটোর ভাষায় এর কোডনেম SS-26 Stone। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় এই প্রকল্পের সূচনা হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এটি স্থগিত হয়ে যায়। পরে রাশিয়া প্রকল্পটি পুনরায় চালু করে। ১৯৯৬ সালে প্রথম সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয় এবং ২০০৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে এটি রাশিয়ার অন্যতম নির্ভরযোগ্য ট্যাকটিক্যাল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
ইস্কান্দার-এম-এর কার্যকর পাল্লা প্রায় ৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার। এটি সর্বোচ্চ ৪৮০ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ওয়ারহেড বহন করতে পারে। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, এর সামরিক সংস্করণে প্রচলিত বিস্ফোরক ছাড়াও পারমাণবিক ওয়ারহেড ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। মিসাইলটির দৈর্ঘ্য ৭.৩ মিটার, ব্যাস ০.৯২ মিটার এবং এটি একধাপের কঠিন জ্বালানিচালিত (Solid Propellant) রকেট মোটর ব্যবহার করে।
বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষকের মতে, এর গতি ম্যাক ৬ থেকে ৭ পর্যন্ত হতে পারে।
কেন এটিকে এত ভয়ংকর মনে করা হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইস্কান্দার-এম-এর আসল শক্তি শুধু গতি নয়, বরং এর গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা।
সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্দিষ্ট পথে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু ইস্কান্দার-এম শেষ পর্যায়ে দিক পরিবর্তন (Terminal Maneuver) করতে পারে বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি এটি ডিকয় বা বিভ্রান্তিকর লক্ষ্যবস্তু নিক্ষেপ এবং ইলেকট্রনিক কাউন্টারমেজার ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম বলে রাশিয়া দাবি করে। এ কারণে এটি প্রতিরোধ করা তুলনামূলক কঠিন বলে মনে করেন অনেক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
কী ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে?
ইস্কান্দার-এম মূলত শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হলো—
বিমানঘাঁটি
সামরিক সদর দপ্তর
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
রাডার স্টেশন
গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার
কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার
গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো
কী ধরনের ওয়ারহেড বহন করতে পারে?
রাশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ইস্কান্দার-এম বহন করতে পারে—
উচ্চ বিস্ফোরক (High Explosive)
ক্লাস্টার ওয়ারহেড
বাঙ্কার-বাস্টার
থার্মোবারিক বা ফুয়েল-এয়ার বিস্ফোরক
পারমাণবিক ওয়ারহেড (রাশিয়ান সামরিক সংস্করণ)
ইস্কান্দার-এম ও ইস্কান্দার-ই-এর মধ্যে পার্থক্য
রাশিয়া রপ্তানির জন্য ইস্কান্দার-ই (Iskander-E) নামে আলাদা সংস্করণ তৈরি করেছে। এই সংস্করণের সর্বোচ্চ পাল্লা মাত্র ২৮০ কিলোমিটার এবং এটি কেবল প্রচলিত ওয়ারহেড বহনের উপযোগী। অন্যদিকে ইস্কান্দার-এম-এর পাল্লা ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এবং এর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
কোন কোন দেশ এটি ব্যবহার করে?
বর্তমানে ইস্কান্দার-এম পরিচালনা করছে—
রাশিয়া
বেলারুশ
অন্যদিকে ইস্কান্দার-ই পরিচালনা করছে—
আর্মেনিয়া
আলজেরিয়া
ইরানের নাম এখনো নিশ্চিত ব্যবহারকারীর তালিকায় যুক্ত হয়নি। কারণ দেশটির কাছে ইস্কান্দার-এম সরবরাহের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধে ইস্কান্দারের ভূমিকা
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের পর ইস্কান্দার-এম বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। ইউক্রেনের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি, সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রগুদাম ও অবকাঠামোতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সব সময় সম্ভব হয়নি, তবুও এটি রাশিয়ার অন্যতম প্রধান ট্যাকটিক্যাল স্ট্রাইক অস্ত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কতটা শক্তিশালী?
ইরান বহু বছর ধরে নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তুলেছে। দেশটির হাতে ইতোমধ্যে খাইবারশেকান, হাজ কাসেম, ফাত্তাহ, সেজিল, ইমাদ, ঘাদরসহ বিভিন্ন ধরনের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
বিশেষ করে সম্প্রতি উন্মোচিত ‘ফাত্তাহ’ ক্ষেপণাস্ত্রকে ইরান হাইপারসনিক বলে দাবি করেছে, যদিও এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
তাহলে ইস্কান্দার-এম কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার বড় হলেও ইস্কান্দার-এম একটি অত্যন্ত নির্ভুল, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল এবং যুদ্ধে পরীক্ষিত ট্যাকটিক্যাল অস্ত্র। যদি সত্যিই রাশিয়া এটি ইরানকে সরবরাহ করে থাকে, তাহলে ইরানের সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী সামরিক স্থাপনা বা আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে দ্রুত ও নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে ইস্কান্দার-এম পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। এর ফলে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।
একই সঙ্গে এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহ রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হতে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য বিশ্লেষণ নির্ভর করছে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর—রাশিয়া সত্যিই ইরানকে ইস্কান্দার-এম দিয়েছে কি না। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক নিশ্চিতকরণ না থাকায় বিষয়টি এখনও দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে পরিস্থিতির আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।##

