-- বিজ্ঞাপন ---

আকাশসীমা সুরক্ষায় বিমানবাহিনী: বাংলাদেশ স্কোয়াড্রনে যুক্ত হতে পারে ৪.৫ প্রজন্মের ‘J-10CE’

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং আকাশসীমার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী (BAF) তার ‘ফোর্সেস গোল’ ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা সূত্র ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চীন থেকে ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক J-10CE মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৪টি (দুই স্কোয়াড্রন) যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হয়েছে, যা বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে রয়েছে।

বিশেষ করে, বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক চীন সফর ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই ডেডিকেটেড ফাইটার জেট ক্রয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও ‘ব্যাটল প্রভেন’ সক্ষমতা
চীনের বিশ্বখ্যাত ‘চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন’ (CAC) কর্তৃক নির্মিত J-10C সিরিজের এক্সপোর্ট ভার্সন হলো এই J-10CE। ২০০৫ সালে চীনা বিমানবাহিনীতে (PLAAF) প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি ক্রমাগত আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে গেছে। J-10A এবং J-10B সংস্করণের সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটিগুলো দূর করে J-10C/CE সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে:

অ্যাডভান্সড এইএসএ (AESA) রাডার: যা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ও রাডার জ্যামিং প্রযুক্তিকে ফাঁকি দিতে অত্যন্ত কার্যকর।

দেশীয় ইঞ্জিন প্রযুক্তি: পূর্বে ব্যবহৃত রাশিয়ার তৈরি AL-31F ইঞ্জিনের পরিবর্তে এখন এতে চীনের নিজস্ব প্রযুক্তির অত্যন্ত শক্তিশালী WS-10B আফটারবার্নিং টার্বোফ্যান ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবস্থা: এই ফাইটার জেটের মূল শক্তি এর ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ (BVR) মিসাইল সক্ষমতা। এটি PL-15E লং রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল (যার এক্সপোর্ট ভার্সনের রেঞ্জ প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার) এবং PL-12 মিসাইল বহনে সক্ষম।

গতি, রেঞ্জ ও যুদ্ধক্ষমতা
J-10CE যুদ্ধবিমানটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২.১ ম্যাক (শব্দের চেয়ে ২ গুণেরও বেশি) গতিতে উড়তে পারে। এর গড় কমব্যাট রেঞ্জ প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার এবং এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ ৫৯,০০০ ফুট উচ্চতায় উঠে নিখুঁতভাবে কমব্যাট মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম। প্রায় ৭.২ টন পেলোড (অস্ত্র ও জ্বালানি) বহনে সক্ষম এই যুদ্ধবিমানটি একই সাথে আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে সমানতালে আক্রমণ চালাতে পারে।

অর্থনৈতিক সমীকরণ: সাশ্রয়ী রক্ষণাবেক্ষণ খরচ
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে ইউরোপীয় বা মার্কিন সমমানের যুদ্ধবিমানের তুলনায় J-10CE অনেকটাই সাশ্রয়ী। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এর প্রতি ইউনিটের বেস প্রাইস (শুধু বিমান) প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ডলার। তবে ফুল প্যাকেজ অর্থাৎ পাইলট ও ক্রু ট্রেনিং, আধুনিক অস্ত্র ও মিসাইল সিস্টেম, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি (Maintenance Package) সহ পার-ইউনিট খরচ দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা ফাইটার জেটের তুলনায় এর প্রতি ঘণ্টার অপারেটিং খরচ (আনুমানিক ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ ডলার) বেশ কম, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কৌশলগত গুরুত্ব ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
বর্তমানে চীনের বিমানবাহিনীতে প্রায় ৬০০টিরও বেশি J-10 সিরিজের যুদ্ধবিমান সক্রিয় রয়েছে, যা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষার মূল মেরুদণ্ড। এছাড়া, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানও তাদের বিমানবাহিনীতে এই J-10CE স্কোয়াড্রন সফলভাবে যুক্ত করেছে এবং ভারতের রাফেল (Rafale) ফাইটার জেটের কাউন্টার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তিগুলোর বিমানবাহিনীর দ্রুত আধুনিকায়ন বাংলাদেশের আকাশসীমার নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই অবস্থায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আকাশ প্রতিরক্ষায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিমানবাহিনীকে ‘ফোর-প্লাস’ প্রজন্মে উন্নীত করার জন্য J-10CE যুদ্ধবিমান ক্রয়ের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কৌশলগতভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।##