কাজী মনসুর#
প্রাচীন কাল থেকেই চীন এক রহস্যময় এবং বিস্ময়কর রাষ্ট্র। এই বিশাল সাম্রাজ্যকে বহিরাগত শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম এক আশ্চর্যের নিদর্শন,চীনের মহাপ্রাচীর (The Great Wall of China)। উদ্দেশ্য: মূলত ইউরেশীয় অঞ্চলের যাযাবর ও বিভিন্ন আক্রমণকারী গোষ্ঠীর হাত থেকে সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক উত্তর সীমান্ত রক্ষা করার জন্য এটি তৈরি করা হয়।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের দিকেই এর বিভিন্ন অংশের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ২২০-২০৬ অব্দে চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এই বিচ্ছিন্ন দেয়ালগুলোকে একত্রিত ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন, যা ইতিহাসখ্যাত। তবে সেই সময়ের প্রাচীরের খুব কম অংশই এখন টিকে আছে। বর্তমান যুগে আমরা যে প্রাচীরটি দেখি, তার অধিকাংশ অংশই নির্মিত হয়েছে মিং রাজবংশের (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে। এটি পাথর, ইট, কাঠ ও মাটির সংমিশ্রণে তৈরি।
প্রতিরক্ষার পাশাপাশি এই মহাপ্রাচীর আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হতো, সীমান্ত ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, সিল্ক রোড বা রেশম পথ দিয়ে যাতায়াত করা পণ্যের ওপর শুল্ক ধার্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা হতো। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সাম্রাজ্যে মানুষের আসা-যা যাওয়া বা অভিবাসন তদারকি করা হতো। যোগাযোগ ও পরিবহন, প্রাচীরের ওয়াচ টাওয়ার (ঘড়ির টাওয়ার), সেনা ব্যারাক ও গ্যারিসন স্টেশনগুলো ধোঁয়া বা আগুনের সংকেত পাঠিয়ে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করত। এছাড়া এই দেয়াল পথটি একটি চমৎকার পরিবহন করিডোর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
বিভিন্ন রাজবংশের তৈরি সীমানা প্রাচীরগুলো মঙ্গোলিয়ান ধাপের প্রান্ত ঘেঁষে পূর্বে দান্ডং থেকে শুরু করে পশ্চিমে লোপ লেক এবং উত্তরে সাইন-রাশিয়ান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। মিং রাজবংশের অংশ আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, মিং রাজবংশের তৈরি দেয়ালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮,৮৫০ কিলোমিটার (৫,৫০০ মাইল)। এর মধ্যে মূল দেয়াল ৬,২৫৯ কিমি এবং বাকি অংশ প্রাকৃতিক পাহাড় ও নদী দিয়ে ঘেরা। মোট দৈর্ঘ্য, সব শাখা-প্রশাখাসহ পুরো প্রাচীরটির সামগ্রিক দৈর্ঘ্য প্রায় ২১,১৯৬ কিলোমিটার (১৩,১৭১ মাইল), যা মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্থাপত্য কীর্তি।
চীনা ও ইংরেজি ভাষায় এই প্রাচীরের ভিন্ন ভিন্ন নাম ও তাৎপর্য রয়েছে, লং ওয়াল (Chángchéng), চীনা ঐতিহাসিক সিমা কিয়ানের রেকর্ড অনুসারে এর নাম ছিল “লং ওয়াল” বা দীর্ঘ প্রাচীর। চীনা ভাষায় ‘চেং’ শব্দের অর্থ মূলত শহরের চারপাশের প্রাচীরকে বোঝাত, যা এখন ‘শহর’ অর্থেই বেশি ব্যবহৃত হয়। দশ-হাজার মাইলের দীর্ঘ প্রাচীর (Wànlǐ Chángchéng), ঐতিহ্যগতভাবে চীনা ‘লি’ (lǐ) মাইলের পরিমাপ বর্তমানের মতো ছিল না (৩ লি = ১ ইংরেজি মাইল)। তবে চীনা সংস্কৃতিতে “দশ হাজার” বা ‘ওয়ান’ (wàn) শব্দটির ব্যবহার কেবল নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝাতে নয়, বরং “অসংখ্য” বা “অসীম” বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। প্রথম সম্রাটের নিষ্ঠুরতার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে থাকায় পরবর্তী রাজবংশগুলো একে সরাসরি ‘লং ওয়াল’ না বলে “সীমান্ত”, “র্যাম্পার্ট”, “বাধা” কিংবা কাব্যিক নামে “বেগুনি ফ্রন্টিয়ার” এবং “আর্থ ড্রাগন” (মাটির ড্রাগন) বলেও ডাকত।
কিন্তু হাজার বছর পুরোনো এই প্রাচীর আজ কেমন আছে? বর্তমান যুগে এটি কেবল চীনের সুরক্ষাকবচই নয়, বরং গোটা পৃথিবীর মানুষের কাছে এক পরম বিস্ময় এবং পর্যটনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
কেমন মানুষ আসে এই মহাপ্রাচীর দেখতে?
চীনের মহাপ্রাচীর পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে কোটি কোটি মানুষ এই প্রাচীরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি থেকে ১.৫ কোটিরও বেশি পর্যটক এই মহাপ্রাচীর ভ্রমণ করেন। বিশেষ করে চীনের ‘বাদালিং’ (Badaling) নামক অংশটি পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়, যেখানে ছুটির দিনগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ ভ্রমণপ্রেমী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক তারকা ও বিশ্বনেতারাও চীন সফরে এলে এই প্রাচীর দর্শনে যেতে ভুল করেন না।
পর্যটকদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে?
বিশাল এই প্রাচীর ভ্রমণ যেন পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক ও স্মরণীয় হয়, সেজন্য চীন সরকার সেখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেছে:
ক্যাবল কার ও রোপওয়ে: মহাপ্রাচীরের উচুঁ ও খাড়া পাহাড়ের অংশগুলোতে সহজে ওঠার জন্য আধুনিক ক্যাবল কার (Cable Car) এবং রোপওয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে শিশু এবং বয়স্ক পর্যটকরাও অনায়াসে প্রাচীরের চূড়ায় পৌঁছাতে পারেন।
টবোগান রাইড (Toboggan Ride): যারা একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য প্রাচীর থেকে নিচে নামার জন্য রয়েছে বিশেষ স্লাইড বা টবোগান রাইড। এর মাধ্যমে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চমৎকার এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সাথে নিচে নেমে আসা যায়।
সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা: বেইজিং শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে মহাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশে (যেমন: বাদালিং বা মুতিয়ানইউ) যাওয়ার জন্য নিয়মিত এক্সপ্রেস বাস এবং বুলেট ট্রেনের চমৎকার সংযোগ রয়েছে, যার ফলে পর্যটকরা খুব অল্প সময়েই সেখানে পৌঁছাতে পারেন।
খাবার ও কেনাকাটার সুবিধা: প্রাচীরের প্রবেশদ্বার এবং আশেপাশের এলাকাগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের রেস্তোরাঁ, কফি শপ এবং ঐতিহ্যবাহী চিনা খাবারের দোকান রয়েছে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য স্মারক বা স্যুভেনির কেনার জন্য রয়েছে বড় বাজার।
নিরাপত্তা ও বিশ্রামাগার: পুরো পর্যটন এলাকাটি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রহরী ও সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাধীন। এছাড়া হাঁটার পথের মাঝে মাঝে পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য বসার জায়গা এবং আধুনিক শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে।
আজ এই প্রাচীর কেবল চীনের সুরক্ষাকবচই নয়, বরং গোটা পৃথিবীর মানুষের কাছে এক পরম বিস্ময়ের নাম।##

