সিরাজুর রহমান#
বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ সুপারকম্পিউটারের তালিকা TOP500-এর সর্বশেষ (৬৭তম) সংস্করণে এক বড় পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির সুপারকম্পিউটার হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে চীনের নতুন প্রজন্মের সুপারকম্পিউটার ‘লাইনশাইন’ (LineShine)।
গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে জার্মানির হামবুর্গে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে এই হালনাগাদ তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো চীনা সুপারকম্পিউটার বিশ্বমঞ্চে শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করল।গতি ও পারফরম্যান্সে অনন্য রেকর্ডTOP500-এর প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ‘লাইনশাইন’ সুপারকম্পিউটিং সিস্টেমের সর্বোচ্চ গণনাগত গতি (HPL Benchmark) হচ্ছে ২.১৯৮ এক্সাফ্লপস (Exaflop/s)। সহজ ভাষায়, এটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২.২ কুইন্টিলিয়নেরও (১-এর পর ১৮টি শূন্য) বেশি গাণিতিক অপারেশন সম্পন্ন করতে সক্ষম। এর ফলে এটি পূর্বে শীর্ষস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার ‘এল ক্যাপিটান’ (El Capitan)-কে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছে, যার বর্তমান পারফরম্যান্স হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ১.৮০৯ এক্সাফ্লপস।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিচারে লাইনশাইন মার্কিন প্রতিদ্বন্দীর চেয়ে প্রায় ২০% বেশি গতিসম্পন্ন।সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির মেলবন্ধনসবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে এটি তৈরি করেছে চীন।
শেনঝেনের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টার (NSCS)-এ স্থাপিত এই সিস্টেমটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিচে দেওয়া হলো:
ডিজাইন ও নির্মাতা: শেনঝেন ক্লাউড কম্পিউটিং সেন্টার।প্ল্যাটফর্ম: কাস্টমাইজড ‘লিংকুন’ (LingKun) প্ল্যাটফর্ম। প্রসেসর: ৩MD-কোর বা জিপিইউ এক্সিলারেটরের পরিবর্তে সম্পূর্ণ সিপিইউ-ভিত্তিক LX2 প্রসেসর (৩০৪-কোর বিশিষ্ট)। ইন্টারকানেক্ট: নিজস্ব মালিকানাধীন LingQi নেটওয়ার্ক ইন্টারকানেক্ট। অপারেটিং সিস্টেম: চীনের নিজস্ব Kylin OS (Linux ভিত্তিক)।
বিশাল প্রসেসর কোর ও শক্তি সক্ষমতাএই হাইস্পিড সুপারকম্পিউটিং সিস্টেমটিতে প্রসেসর কোরের সংখ্যা প্রায় ১৩.৭৯ মিলিয়ন (১৩,৭৮৯,৪৪০)। তবে এর বিশাল শক্তির পাশাপাশি এটি পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। সিস্টেমটি চালাতে প্রায় ৪২.২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগে এবং এর শক্তি দক্ষতা (Energy Efficiency) প্রতি ওয়াটে প্রায় ৫২.০৭ গিগাফ্লপস। অন্যান্য বেঞ্চমার্কেও আধিপত্যকেবল মূল TOP500 তালিকাতেই নয়, মেমোরি ও ডেটা ট্রান্সফার ব্যান্ডউইথ পরিমাপক HPCG বেঞ্চমার্কেও ২২.০০ পেটফ্লপস স্কোর নিয়ে ‘লাইনশাইন’ শীর্ষস্থান অর্জন করেছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিশ্র-নির্ভুলতা পরিমাপক HPL-MxP বেঞ্চমার্কে ৭.৯২ এক্সাফ্লপ পারফরম্যান্স নিয়ে এটি চতুর্থ স্থানে রয়েছে।বিশ্বমঞ্চে বর্তমান সেরা ৫ সুপারকম্পিউটারর্যাংকসুপারকম্পিউটারের নামদেশপারফরম্যান্স (HPL – Exaflop/s)১লাইনশাইন (LineShine)চীন২.১৯৮২এল ক্যাপিটান (El Capitan)যুক্তরাষ্ট্র১.৮০৯৩ফ্রন্টিয়ার (Frontier)যুক্তরাষ্ট্র১.৩৫৩৪অরোরা (Aurora)যুক্তরাষ্ট্র১.০১২৫জুপিটার বুস্টার (JUPITER Booster)জার্মানি১.০০০যেসব গবেষণায় ব্যবহৃত হবে’লাইনশাইন’ সুপারকম্পিউটারটি মূলত অত্যন্ত জটিল বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল গবেষণার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. নিখুঁত আবহাওয়া ও জলবায়ু মডেলিং।2. জীবন বিজ্ঞান ও নতুন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কার।৩. মানব মস্তিষ্ক সংক্রান্ত জটিল গবেষণা।৪. উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মডেলের প্রশিক্ষণ। ৫. জ্যোতির্বিদ্যা ও অতি-আগাম ভূমিকম্প পূর্বাভাস ব্যবস্থা।
উপসংহার: সুপারকম্পিউটিংয়ের এই নতুন ‘এক্সাস্কেল’ যুগে লাইনশাইনের প্রবেশ চীনের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব (Technological Sovereignty) এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সক্ষমতাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।#

