কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
ভারতের জাতীয় ফ্ল্যাগশিপ এয়ারলাইন্স Air India ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভারতীয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেই এবার নতুন করে অপারেশনাল চাপ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সংস্থাটিকে বড় ক্ষতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। দ্যা হিন্দু নিউজ এজেন্সির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরে এয়ার ইন্ডিয়া প্রায় ২.৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লোকসান ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী এই এয়ারলাইন্সের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আর্থিক ক্ষতির অন্যতম বড় কারণ পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়া। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে পাকিস্তান তাদের আকাশপথে ভারতীয় বিমানের চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করলে এয়ার ইন্ডিয়াকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনায় সময় বাড়ছে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত। এতে একদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিমানের ব্যবহার দক্ষতা কমে যাচ্ছে। একটি বিমান কম সময়ে যত বেশি ট্রিপ দিতে পারত, এখন তা পারছে না। এতে অপারেটিং ইনকামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার বর্তমান সংকট বুঝতে হলে এর অতীত ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কয়েক দশক ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হওয়ার পর ক্রমাগত লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। অবশেষে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগোষ্ঠী Tata Group এয়ার ইন্ডিয়াকে অধিগ্রহণ করে। প্রায় ১৮ হাজার কোটি রুপির এই চুক্তির আওতায় সরকারকে নগদ ২,৭০০ কোটি রুপি প্রদান করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ ঋণের দায়ভারও টাটা গ্রুপ নিজেদের কাঁধে নেয়।
টাটা গ্রুপের হাতে যাওয়ার পর এয়ার ইন্ডিয়াকে নতুনভাবে সাজানোর বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পুরোনো বিমানের পরিবর্তে আধুনিক উড়োজাহাজ যুক্ত করা, আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা, কেবিন আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল সিস্টেম উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার লক্ষ্যে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বৃহত্তম বিমান ক্রয় চুক্তিগুলোর একটি সম্পন্ন করে, যেখানে শত শত নতুন বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সেই পুনর্গঠনের মাঝপথেই বর্তমান আর্থিক চাপ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বর্তমানে এয়ার ইন্ডিয়া প্রায় ১৮৯টি বিমান নিয়ে ৮৭টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে কিছু রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমানো হয়েছে এবং কয়েকটি কম লাভজনক রুট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে অপারেশনাল ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংস্থাটি নতুন করে রুট ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করছে।
এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে Singapore Airlines। বর্তমানে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এয়ার ইন্ডিয়ার প্রায় ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক। আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত এই সংস্থাটির সহযোগিতাকে এয়ার ইন্ডিয়ার পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর্থিক চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত মূলধনের প্রয়োজন হওয়ায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে দুই প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর হতে পারে।
তবে সংকটের মাঝেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। সর্বশেষ Skytrax World Airline Awards 2025 অনুযায়ী এয়ার ইন্ডিয়া বিশ্বের শীর্ষ ১০০ এয়ারলাইন্সের তালিকায় জায়গা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে তাদের অবস্থান ৮৪তম। অন্যদিকে ভারতের আরেক বড় এয়ারলাইন্স IndiGo রয়েছে ৩৯তম স্থানে। যদিও র্যাঙ্কিংয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার অবস্থান খুব উপরের দিকে নয়, তবুও দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে আন্তর্জাতিক তালিকায় টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানটির জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স হিসেবেও এখনো এয়ার ইন্ডিয়ার পরিচিতি রয়েছে।
বিমান পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে প্রায় সব বড় এয়ারলাইন্সই বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট এবং রুট সীমাবদ্ধতার চাপে রয়েছে। তবে এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য চ্যালেঞ্জটা আরও বড়, কারণ প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে পুনর্গঠন এবং বাজার প্রতিযোগিতা—দুই ফ্রন্টেই লড়াই করছে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী এয়ারলাইন্স, ইউরোপীয় ক্যারিয়ার এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রুত উত্থান ঘটানো বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
তারপরও আশাবাদ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। টাটা গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, বহরে আধুনিক বিমান যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক সেবা উন্নয়ন এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে এয়ার ইন্ডিয়াকে আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এয়ারলাইন্স হিসেবে নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের যে স্বপ্ন নিয়ে পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল, বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তথ্যসূত্র: Wikipedia, Roeters, The Hindu, (Skytrax) World Airline Awards 2025,

