-- বিজ্ঞাপন ---

তামিলনাডুতে বিজয়ের উত্থান: বিজেপির নতুন চ্যালেঞ্জ, কংগ্রেসের নতুন কৌশল

কাজী আবুল মনসুর#

দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে যেন নতুন এক যুগের সূচনা হলো। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জোটের টানাপোড়েন, পর্দার আড়ালের দরকষাকষি আর নাটকীয় অপেক্ষার পর অবশেষে তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা থালাপতি বিজয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘তামিলগা ভেট্রি কাজগম’ (টিভিকে) সরকার গঠনের অনুমতি পাওয়ার পর শুধু চেন্নাই নয়, গোটা দক্ষিণ ভারতেই এখন আলোচনা, এ কি শুধুই এক তারকার রাজনৈতিক উত্থান, নাকি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের শুরু?

গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে টিভিকে ১০৮টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তারা তখনও ১০ আসন দূরে ছিল। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই শুরু হয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। প্রথমদিকে পরিস্থিতি মোটেও সহজ ছিল না। রাজ্যপাল সরাসরি সরকার গঠনের অনুমতি দেননি। সাংবিধানিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনও দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে বিজয়কে অপেক্ষা করতে হয়।

দুবার প্রয়োজনীয় সমর্থনের তালিকা পূর্ণাঙ্গভাবে দেখাতে না পারায় সরকার গঠনের প্রক্রিয়া থমকে যায়। রাজনৈতিক মহলে তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, সিনেমার পর্দার জনপ্রিয়তা কি বাস্তবের ক্ষমতার রাজনীতিতে যথেষ্ট? নাকি থালাপতির রাজনৈতিক যাত্রা শুরুতেই ধাক্কা খেতে চলেছে?

কিন্তু ঠিক সেই সময় থেকেই বদলাতে থাকে সমীকরণ। ডিএমকে জোটের একাধিক শরিক দল ধীরে ধীরে অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিআইএম, ভিসিকে এবং আইইউএমএলের কয়েকজন বিধায়ক বিজয়ের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। সব মিলিয়ে ১২০ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানান বিজয়। গত এক সপ্তাহে চারবার বৈঠকের পর অবশেষে আসে সবুজ সংকেত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থনের পেছনে শুধু তামিলনাডুর আঞ্চলিক রাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর সমীকরণও কাজ করেছে। বিশেষ করে কংগ্রেসের ভূমিকা এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়েও শেষ মুহূর্তে বিজয়ের পাশে দাঁড়ানো নিছক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয় বলেই মনে করা হচ্ছে।

গত কয়েক বছরে রাহুল গান্ধী বারবার আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিজেপিবিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসর তৈরির কৌশল থেকেই কংগ্রেস এখন অনেক বেশি নমনীয় ভূমিকা নিচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। সেই প্রেক্ষাপটে বিজয়ের মতো জনপ্রিয়, তরুণপ্রিয় এবং দক্ষিণ ভারতে দ্রুত উত্থানশীল এক নেতাকে পুরোপুরি বিরোধিতার পথে ঠেলে দিতে চায়নি কংগ্রেস। বরং তাঁকে সমর্থন দিয়ে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্পর্কের দরজা খোলা রাখতেই আগ্রহী ছিল দলটি।

এই অবস্থার মধ্যেই সবচেয়ে চাপে পড়ে বিজেপি। কারণ বহু বছর ধরেই দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে তামিলনাডুতে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে দলটি। কিন্তু তামিল রাজনীতির বাস্তবতা বরাবরই আলাদা। ভাষা, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক পরিচয় এবং দ্রাবিড়ীয় রাজনৈতিক আবেগ এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই জায়গায় বিজয় যদি নিজেকে “তামিল স্বার্থের মুখ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তার আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই বিজয়ের বক্তব্যে কেন্দ্রীয় নীতির সমালোচনা, ভাষা রাজনীতি এবং রাজ্যের অধিকারের প্রশ্ন গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বিশেষ করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা কিংবা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের মতো বিষয়ে তাঁর অবস্থান বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব আরও স্পষ্ট করে। ফলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়, বিজয়ের উত্থান কি দক্ষিণ ভারতে বিজেপিবিরোধী রাজনীতির নতুন কেন্দ্র তৈরি করবে?

তবে বিজয়ের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সিনেমার জনপ্রিয়তা মানুষকে আবেগে ভাসাতে পারে, কিন্তু প্রশাসন চালাতে প্রয়োজন দক্ষতা, স্থিতিশীলতা এবং বাস্তব ফল। তামিলনাডুর মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে মানুষের প্রত্যাশাও বিশাল। কর্মসংস্থান, শিল্প বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি, বন্যা ও অবকাঠামো, সব ক্ষেত্রেই দ্রুত ফল দেখানোর চাপ থাকবে তাঁর ওপর।

রাজনৈতিকভাবে আরও বড় প্রশ্ন হলো, বিজয় কি কেবল আঞ্চলিক নেতা হিসেবেই থাকবেন, নাকি ভবিষ্যতে জাতীয় বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠবেন? কারণ দক্ষিণ ভারতে তাঁর জনপ্রিয়তা ইতোমধ্যেই তামিলনাডুর গণ্ডি ছাড়িয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অন্য অনেক আঞ্চলিক নেতার চেয়ে আলাদা।

আজকের শপথ অনুষ্ঠান তাই শুধু ক্ষমতা গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি একদিকে যেমন তামিলনাডুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তনের প্রতীক, অন্যদিকে ভারতের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণেরও ইঙ্গিত।

একসময় সিনেমার পর্দায় কাল্পনিক মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করা থালাপতি বিজয় আজ বাস্তবেই প্রশাসনের শীর্ষে বসতে চলেছেন। কিন্তু এখন থেকে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ শুধু তামিলনাডু নয়, দিল্লির রাজনীতিও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। কারণ এই উত্থান যদি সফল হয়, তাহলে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক শক্তির জন্ম হতে পারে—যে শক্তি ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির ভারসাম্যও বদলে দিতে সক্ষম।#