কাজী আবুল মনসুর#
“মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এ ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে বহু ভবন ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ, আহতের সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট Delcy Rodríguez দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। উদ্ধারকাজ, চিকিৎসা সহায়তা এবং পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলা দল ও মানবিক সহায়তা প্রস্তুত করছে বলে জানিয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। ভূমিকম্পে প্রাণহানি, ভবন ধস এবং ব্যাপক আতঙ্কের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, ভেনেজুয়েলায় কেন বারবার এমন ভূমিকম্প হয়? এটি কি আকস্মিক কোনো ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রেখেছে। পৃথিবীর ভূত্বক বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট ক্রমাগত নড়াচড়া করে এবং একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ, ঘর্ষণ বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। ভেনেজুয়েলা এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ক্যারিবীয় প্লেট এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট পরস্পরের সংস্পর্শে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা শক্তি যখন হঠাৎ মুক্তি পায়, তখনই সৃষ্টি হয় শক্তিশালী ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ভেনেজুয়েলা
ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূল বরাবর বিস্তৃত রয়েছে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন। এসব ফল্টের মধ্যে বোকোনো, সান সেবাস্তিয়ান এবং এল পিলার ফল্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই ফল্টগুলো কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং নিয়মিতভাবে ভূকম্পন সৃষ্টি করে থাকে।
ক্যারিবীয় প্লেট প্রতি বছর প্রায় দুই সেন্টিমিটার হারে পূর্বদিকে সরে যাচ্ছে। এই ধীরগতির সঞ্চালন বছরের পর বছর ধরে ভূগর্ভে চাপ তৈরি করে। একসময় সেই চাপ সহনসীমা অতিক্রম করলে হঠাৎ শক্তি নির্গত হয় এবং ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৮১২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প
ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ভূমিকম্পগুলোর একটি সংঘটিত হয় ১৮১২ সালের ২৬ মার্চ। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
সেই সময় দেশটি স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রামে ব্যস্ত ছিল। ভূমিকম্পে অসংখ্য গির্জা, সরকারি ভবন ও বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এই বিপর্যয় স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথেও প্রভাব ফেলেছিল। আজও ১৮১২ সালের ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬৭ সালের কারাকাস ট্র্যাজেডি
প্রায় দেড় শতাব্দী পর ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানী কারাকাস। ৬.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পে বহু বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শতাধিক মানুষ নিহত হন।
এই ঘটনা ভেনেজুয়েলাকে আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে ভবন নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয় এবং প্রকৌশল মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক দশকের বড় ভূমিকম্প
গত কয়েক দশকেও ভেনেজুয়েলা একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯৭ সালে দেশটির পূর্বাঞ্চলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। ২০১৮ সালে ৭.৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ক্যারিবীয় সাগর অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে ভেনেজুয়েলা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং আশপাশের দেশগুলোকে কাঁপিয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পও প্রমাণ করেছে যে দেশটির ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলে ভবিষ্যতেও শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কেন বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভূমিকম্পের মাত্রাই নয়, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাও ক্ষয়ক্ষতির বড় কারণ। রাজধানী কারাকাস এবং অন্যান্য বড় শহরে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অনেক পুরোনো ভবন আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত নয়।
ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও কখনো কখনো বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতি উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তোলে।
ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূমিকম্প বন্ধ করার কোনো উপায় নেই। তবে উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। একই সঙ্গে এটি সতর্ক করে দিয়েছে যে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোকে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। দুই শতকের ইতিহাস বলছে, ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশটির ভূগোল ও ভূতত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।##

