কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় মানবজাতির বর্তমান প্রযুক্তি কতটা সীমিত, তা বোঝার জন্য দূরবর্তী এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবী থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহে বর্তমান প্রযুক্তির মহাকাশযান পাঠাতেই সময় লাগতে পারে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার বছর। অথচ মহাজাগতিক হিসেবে এই দূরত্বকে খুব বেশি দূরত্ব বলেই মনে করা হয় না। আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে ছায়াপথের ব্যাস প্রায় ১ লাখ আলোকবর্ষ। NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, এই বিশাল ছায়াপথে আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে এবং অন্তত সমসংখ্যক গ্রহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু এসব নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্রহের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের নিশ্চিত জ্ঞান খুব বেশি পুরোনো নয়। ১৯৯২ সালে বিজ্ঞানীরা পালসারকে প্রদক্ষিণকারী দুটি গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। তবে স্বাভাবিক বা সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী প্রথম নিশ্চিত এক্সোপ্ল্যানেট হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয় ৫১ পেগাসি বি (51 Pegasi b), যার আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ৫১ পেগাসি বি একটি গ্যাসীয় দৈত্য গ্রহ। এটি তার নক্ষত্রকে মাত্র ৪.২ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে এবং নক্ষত্রটির অত্যন্ত কাছে অবস্থান করে। NASA-এর বর্তমান এক্সোপ্ল্যানেট ক্যাটালগ অনুযায়ী, গ্রহটির কক্ষপথের ব্যাসার্ধ প্রায় ০.০৫২ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক (AU)।
১৯৯৫ সালের সেই আবিষ্কার যেন মহাবিশ্বের অজানা গ্রহগুলোর দরজা খুলে দেয়। এরপর গত তিন দশকে হাজার হাজার বহির্গ্রহ শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। NASA Exoplanet Archive-এর ২০২৬ সালের ৪ জুনের তথ্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত নিশ্চিত এক্সোপ্ল্যানেটের সংখ্যা ছিল ৬,২৯৮টি। এর মধ্যে কিছু গ্রহ পৃথিবীর আকার ও গঠনের কাছাকাছি, আবার কিছু এমন পরিবেশে রয়েছে যার কোনো সরাসরি তুলনা আমাদের সৌরজগতের সঙ্গে করা কঠিন। এসব আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে শুধু নতুন গ্রহের সন্ধানই দেয়নি, বরং মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
৪০ আলোকবর্ষ দূরের রহস্যময় গ্রহ
২০২৪ সালে বিজ্ঞানীদের বিশেষ নজরে আসে Gliese 12 b। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই গ্রহটি একটি শীতল লাল বামন নক্ষত্র Gliese 12-কে প্রদক্ষিণ করছে। NASA-এর TESS মিশনের পর্যবেক্ষণসহ একাধিক টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহটির সন্ধান পাওয়া যায়। Gliese 12 b-এর আকার পৃথিবীর প্রায় ০.৯৩ গুণ এবং এর ভর প্রায় ০.৯৫ পৃথিবীর সমান। NASA-এর বর্তমান ক্যাটালগ অনুযায়ী, এটি ১২.৮ দিনে একবার তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে এবং নক্ষত্র থেকে এর গড় দূরত্ব প্রায় ০.০৬৭ AU। এর হোস্ট নক্ষত্র Gliese 12 সূর্যের তুলনায় মাত্র প্রায় ২৭ শতাংশ আকারের। গ্রহটি পৃথিবীর আকারের কাছাকাছি হওয়ায় এবং অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি অবস্থান করায় এর বায়ুমণ্ডল নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। NASA বলছে, Gliese 12 b-এর বায়ুমণ্ডল আদৌ আছে কি না এবং থাকলে তার গঠন কেমন—তা জানার জন্য James Webb Space Telescope-এর মতো শক্তিশালী পর্যবেক্ষণযন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে কাছের সম্ভাব্য বাসযোগ্য জগত
তবে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের বহির্গ্রহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম প্রক্সিমা সেন্টোরি বি (Proxima Centauri b)। ২০১৬ সালে আবিষ্কৃত এই গ্রহটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টোরিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। প্রক্সিমা সেন্টোরি বি-র বিশেষত্ব হলো, এটি তার নক্ষত্রের তথাকথিত ‘হ্যাবিটেবল জোন’ বা বাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান করছে। এই অঞ্চল এমন একটি দূরত্বের পরিসর, যেখানে উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল থাকলে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার মতো তাপমাত্রা তৈরি হতে পারে।
তবে বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করলেই কোনো গ্রহে প্রাণ রয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। প্রক্সিমা সেন্টোরি বি-র বায়ুমণ্ডল আছে কি না, সেখানে পানি আছে কি না কিংবা প্রাণের জন্য উপযোগী পরিবেশ আদৌ তৈরি হয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। বরং নক্ষত্রটির তীব্র অতিবেগুনি ও অন্যান্য উচ্চশক্তির বিকিরণ গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
৪.২৪ আলোকবর্ষ কতটা দূর?
মহাজাগতিক হিসেবে ৪.২৪ আলোকবর্ষ খুব বেশি দূরত্ব নয়। কিন্তু মানুষের বর্তমান প্রযুক্তির বিচারে এটি প্রায় অকল্পনীয় দূরত্ব।
এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে—প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। অর্থাৎ ৪.২৪ আলোকবর্ষের দূরত্ব প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন কিলোমিটারের সমান। এই দূরত্ব বোঝার জন্য মানবজাতির তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী মহাকাশযান ভয়েজার-১-এর উদাহরণই যথেষ্ট। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণের পর ভয়েজার-১ এখন পৃথিবী থেকে ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থান করছে। NASA-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে ১৫ বিলিয়ন মাইল বা ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে। ভয়েজার-১-এর গতি সূর্যের তুলনায় প্রায় ১৭ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। এই গতিতে একটি আলোকবর্ষ অতিক্রম করতেই সময় লাগবে আনুমানিক ১৮ হাজার ৬০০ বছর। আর প্রক্সিমা সেন্টোরির দূরত্ব প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ। ফলে ভয়েজার-১-এর মতো গতিতে একটি মহাকাশযানকে সরাসরি সেখানে পাঠানো সম্ভব হলে শুধু যাত্রাপথেই সময় লাগবে প্রায় ৭৮ হাজার বছরের কাছাকাছি। অর্থাৎ, যে দূরত্ব মহাজাগতিক মাপকাঠিতে আমাদের ‘পাশের বাড়ি’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, মানুষের বর্তমান প্রযুক্তির কাছে সেটিই কয়েক হাজার প্রজন্মের সমান দীর্ঘ এক যাত্রা।
মহাবিশ্বের কাছে মানুষ কতটা ক্ষুদ্র
ভয়েজার-১-এর প্রায় পাঁচ দশকের যাত্রা এবং প্রক্সিমা সেন্টোরি বি-র মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরত্বের তুলনা মহাবিশ্বের প্রকৃত বিশালতার একটি বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরে। মানুষ ইতোমধ্যে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে যন্ত্র পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করেছে। পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহের সন্ধান পেয়েছে। এমনকি কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের প্রযুক্তিও তৈরি করেছে। কিন্তু নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে মানবজাতি এখনো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। তারপরও অনুসন্ধান থেমে নেই। ১৯৯৫ সালে ৫১ পেগাসি বি আবিষ্কারের পর মাত্র তিন দশকের মধ্যে ৬ হাজারেরও বেশি বহির্গ্রহ নিশ্চিত হয়েছে। NASA বলছে, আমাদের ছায়াপথে সম্ভবত বিলিয়ন বিলিয়ন গ্রহ রয়েছে।
প্রতিটি নতুন গ্রহ তাই শুধু মহাকাশের আরেকটি জগতের সন্ধান নয়; বরং পৃথিবী, প্রাণের সম্ভাবনা এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। মহাজাগতিক এই বিপুল দূরত্ব ও সময়ের হিসাব শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি বিস্ময়কর সত্যই তুলে ধরে—মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষ ও তার বর্তমান প্রযুক্তি অত্যন্ত ক্ষুদ্র। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অজানাকে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে মহাবিশ্বের গভীর রহস্য অনুসন্ধানে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

