সিরাজুর রহমান#
মহাকাশ গবেষণা ও অনুসন্ধানের এবার এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। তারা এখন শনি গ্রহের অন্যতম উপগ্রহ টাইটানে স্পেস মিশন পরিচালনার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। যার আলোকে নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে এই মিশনের মূল মহাকাশযান ‘ড্রাগনফ্লাই’ এর নির্মাণ শুরু করেছে। যেটি হবে মূলত নতুন প্রজন্মের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর চালিত এক অভাবনীয় প্রযুক্তির স্পেসক্রাফট।
আসলে, আমাদের সোলার সিস্টেমের এক বিস্ময়কর রিং বলয় ঘেরা শনিগ্রহ এবং তার বৃহত্তম চাঁদ “টাইটান” বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের কাছে কৌতূহলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। বিশেষ করে অত্যন্ত রহস্যময় “টাইটান” উপগ্রহের ঘন বায়ুমণ্ডল, তরল মিথেনে গঠিত নদী ও হ্রদ, বরফে ঢাকা পৃষ্ঠ এবং এর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য তরল জলের অস্তিত্বের জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে বরাবরই গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
“টাইটান” উপগ্রহে বিদ্যমান এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও বৈশিষ্ট্যের জন্য পৃথিবীর বাইরে এতে এলিয়েন লাইফ বা জটিল প্রাণের সম্ভাব্য আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করেন বিজ্ঞানীরা। এবার এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে যাচাই করতে চায় NASA। এজন্য নাসা এক অতি উচ্চাভিলাষী এবং ব্যয়বহুল রোবটিক স্পেস মিশন পরিচালনা করতে যাচ্ছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ড্রাগনফ্লাই’ (Dragonfly) স্পেস মিশন। এটিকে আগামী ২০২৮ সালের দিকে লঞ্চ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নাসা।
নাসার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘ড্রাগনফ্লাই’ (টাইটান স্পেস প্রোব) মিশন আগামী জুলাই ২০২৮ (planned)-এ ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে। প্রায় ৬ বছরের যাত্রা শেষে, এটি আগামী ২০৩৪ সালে শনির উপগ্রহ টাইটানে বুকে অবতরণ করে এর মূল বৈজ্ঞানিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রম শুরু করবে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘ড্রাগনফ্লাই’ স্পেস-প্রোব লঞ্চ করা থেকে শুরু করে মিশন শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর দীর্ঘ হবে, যার মধ্যে টাইটানে পৌঁছানোর পর প্রায় ৩.৩ বছরজুড়ে চলবে নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অনুসন্ধান কার্যক্রম। নাসার ‘New Frontiers Program’-এর আওতায় পরিচালিত এই স্পেস মিশনে মোট ব্যয় হতে পারে আনুমানিক ৩.৩৫ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি।
‘ড্রাগনফ্লাই’ (Titan rotorcraft lander) মিশনের প্রস্তাব প্রথম ২০১৭ সালের শুরুতে Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory (APL) থেকে NASA-এর “New Frontiers Program”-এ জমা দেওয়া হয়। এরপর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে, NASA এই প্রস্তাবটিকে জমাকৃত বারোটি প্রস্তাবের মধ্যে থেকে দুইটি চূড়ান্ত প্রতিযোগীর একটি হিসেবে নির্বাচিত করে, যাতে এই মিশনের ধারণা ও কার্যক্রম আরও উন্নত ও পরিমার্জিত করা হয়।
এরপর দীর্ঘ মূল্যায়ন ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের পর গত ২৭ জুন ২০১৯ সালে, NASA ড্রাগনফ্লাই মিশনকে তাদের পরিচালিত “New Frontiers Program”-এর আওতায় চতুর্থ স্পেস মিশন হিসেবে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। পরবর্তীতে, গত ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে, NASA আনুষ্ঠানিকভাবে রোবটিক ‘ড্রাগনফ্লাই’ (টাইটান স্পেস প্রোব) মিশনের সমস্ত প্রযুক্তিগত দিক যাচাই ও বিশ্লেষণ করে পূর্ণ অনুমোদন দেয়। যার আলোকে এখন চূড়ান্ত পরিকল্পনা, স্পেস-প্রোব নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের যাবতীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নাসা।
আসলে টাইটান হলো শনির (Saturn) সবচেয়ে বড়ো চাঁদ এবং সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক উপগ্রহ। যেহেতু শনি গ্রহের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার (elliptical) এবং পৃথিবীরও কক্ষপথ পরিবর্তনশীল, তাই পৃথিবী ও টাইটানের মধ্যকার দূরত্ব সময়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে পৃথিবী থেকে টাইটানের গড় দূরত্ব হতে পারে প্রায় ১.২ বিলিয়ন কিলোমিটার বা ১২০ কোটি কিলোমিটার।
অন্যদিকে শনি গ্রহের অন্যতম রহস্যময় উপগ্রহ “টাইটান” হচ্ছে আমাদের সোলার সিস্টেমের একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ, যার রয়েছে নিজস্ব ঘন বায়ুমণ্ডল। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, টাইটানের বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৫-৯৮ শতাংশ নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত। পৃথিবী ছাড়া আমাদের সোলার সিস্টেমে আর কোথাও এমন ঘন বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে টাইটানের নিজস্ব ঘন বায়ুমণ্ডল থাকলেও এটি হচ্ছে একটি চরম শীতল পরিবেশের উপগ্রহ। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, টাইটান উপগ্রহের গড় তাপমাত্রা হতে পারে প্রায় ৯৪ কেলভিন বা -১৭৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এই অতি নিম্ন তাপমাত্রার কারণে এখানে পানির পরিবর্তে ভূপৃষ্ঠে মিথেন ও ইথেন তরল অবস্থায় টিকে রয়েছে। এগুলো নদী, হ্রদ ও সাগরের মতো গঠন তৈরি করেছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
এর আগে, নাসার পাঠানো ক্যাসিনি-হাইগেনস (Cassini-Huygens) মহাকাশযান ২০০৪ সালের ১ জুলাই শনি গ্রহে প্রবেশ করে এবং ২০০৫ সালের ১৪ জানুয়ারি হাইগেনস প্রোব টাইটানের সারফেসে অবতরণ করে। এই হাইগেনস মিশনের তথ্য অনুযায়ী, টাইটানের পৃষ্ঠে রয়েছে পর্বত, উপত্যকা ও মেঘের অস্তিত্ব, যা সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশের সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
ক্যাসিনি-হাইগেনস (Cassini-Huygens) স্পেস মিশন থেকে প্রাপ্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, টাইটানের অতি শীতল বরফের নিচে একটি বিশাল উপগ্লেসিয়াল তরল জলের মহাসাগর লুকিয়ে থাকতে পারে। যা এলিয়েন লাইফ বা জটিল প্রাণধারণের জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ হতে পারে। যদিও এই ধারণা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের একটি প্রেডিকশন বা অনুমান মাত্র।
আর এই রহস্য উন্মোচনে এবার পরিকল্পিতভাবে সেখানে উচ্চ প্রযুক্তির ড্রাগনফ্লাই স্পেস মিশন আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে শুরু করার মহা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নাসা। আর ‘ড্রাগনফ্লাই’ স্পেস-প্রোবটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং autonomous navigation system দ্বারা সজ্জিত করা হচ্ছে। এটি হচ্ছে আসলে নিউক্লিয়ার এনার্জি চালিত ৮-রোটার বিশিষ্ট রোবটিক রোটরক্রাফট বা হেলিকপ্টার। যা অনেকটা বৃহৎ আকারের ড্রোনের মতো কাজ করতে সক্ষম।
এটি Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory (APL) কর্তৃক ডিজাইন ও তৈরি করা হচ্ছে। এই স্পেস প্রোবে শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে MMRTG (Multi-Mission Radioisotope Thermoelectric Generator), যা প্লুটোনিয়ামের তাপ শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করে। যার ফলে, এটি যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশে এবং বিশেষ করে টাইটানের মতো অতি শীতল ও বরফ আচ্ছাদিত পরিবেশে আলোর উপস্থিতি ছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে সক্ষম।
‘ড্রাগনফ্লাই’ (Dragonfly) স্পেস-প্রোব এ রয়েছে স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সমৃদ্ধ অটোনোমাস নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। যা টাইটানের ঝুঁকিপূর্ণ ভূখণ্ডে নিরাপদে অবতরণ ও উড্ডয়ন নিশ্চিত করবে। এর ৮টি স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রিত রোটর ব্লেড টাইটানের ঘন বায়ুমণ্ডলে স্থিতিশীলভাবে উড্ডয়ন করতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন প্রজেক্ট সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।
এতে যুক্ত করা হয়েছে উচ্চ রেজোল্যুশনের ক্যামেরা, স্পেকট্রোমিটার, ভূ-রাসায়নিক বিশ্লেষক যন্ত্র, নমুনা সংগ্রাহক এবং তাপমাত্রা ও পরিবেশগত সেন্সর। যা দিয়ে এটি টাইটানের পৃষ্ঠের রাসায়নিক গঠন ও প্রাণের সম্ভাব্য উপাদান পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবে। এটি কেবল অবতরণস্থলের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর শক্তিশালী রোটরগুলোর সাহায্যে টাইটানের পৃষ্ঠে প্রায় ৭০ মাইল (প্রায় ১১৫ কিলোমিটার) পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবে। পরিকল্পিত ৩.৩ বছরের মিশনের সময় এটি টাইটানের Shangri-La dune fields, Selk crater সহ বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক গবেষণা ও অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাবে।
নাসার বিজ্ঞানীদের মতে, ‘ড্রাগনফ্লাই’ (Dragonfly) স্পেস মিশনের মূল বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য হলো যে, টাইটানের পৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে প্রাক-জৈব রাসায়নিক অণু, জৈব যৌগ এবং জীবনের উপযোগী রাসায়নিক উপাদানের অস্তিত্ব খুঁজে বের করা। পাশাপাশি এটি মূল্যায়ন করবে টাইটানের বরফের নিচে থাকা তরল জলীয় পরিবেশে জীবাণু পর্যায়ের প্রাণ ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে কি না।
আর যদি সত্যিই এমন কোনো জৈব-রাসায়নিক ইঙ্গিত বা প্রাণের চিহ্ন পাওয়া যায়, তবে তা হবে মানবজাতির ইতিহাসে অন্যতম চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। আর সব মিলিয়ে বলা যায়, ড্রাগনফ্লাই মিশন পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধানে এক বৈপ্লবিক মিশন বা অধ্যায় হতে যাচ্ছে। আর টাইটানের বুকে ড্রাগনফ্লাই স্পেস মিশন যদি সফল হয়, তবে তা কেবল টাইটান নয়, বরং আমাদের সোলার সিস্টেমে লুকিয়ে থাকা অন্যান্য বরফ-আবৃত উপগ্রহ, যেমন : ইউরোপা, এনসেলাডাস-এ রোবটিক স্পেস মিশন পরিচালনায় হয়ত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
তথ্যসূত্র : NASA science, Wikipedia, space.com, The Planetary Society, Dragonfly (The Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory), AIAA#
-- বিজ্ঞাপন ---
পূর্ববর্তী সংবাদ

