চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর
পশ্চিমবঙ্গে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ভারতের
কাজী আবুল মনসুর#
বঙ্গোপসাগরের তীরে নতুন এক বন্দর পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তাজপুরের পরিবর্তে পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। বন্দরটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য নিজস্ব ভূখণ্ড ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আর এখানেই বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ইতোমধ্যে একটি সম্ভাবনাময় সমুদ্রদ্বার হিসেবে সামনে এসেছে। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে এ নিয়ে ট্রানজিট ব্যবস্থাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভারত যদি নিজস্ব ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য দাদনপাত্রবাড় বন্দরে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরের সেই সম্ভাব্য আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দাদনপাত্রবাড় কি সত্যিই চট্টগ্রামের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে? আর পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা? চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমুদ্রদ্বার। দেশের কন্টেইনার বাণিজ্যের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই এই বন্দরনির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটি রেকর্ড ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৪৮ টিইইউএস কন্টেনার পরিচালনা করেছে। একই বছর মোট কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এবং ৪ হাজারেরও বেশি জাহাজ বন্দরে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বন্দর প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বন্দর এখনো পিছিয়ে। লয়েড লিস্ট-এর ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কন্টেইনার পোর্ট-এর তালিকায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৬৮তম। ২০২৫ সালে বন্দরটি ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কন্টেনার পরিচালনা করেছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের বন্দরটির কন্টেনার হ্যানডলিং বাড়লেও অন্য অনেক বন্দর আরও দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় র্যাংকিং-এ চট্টগ্রাম এক ধাপ পিছিয়েছে।
চট্টগ্রামের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বড় ‘মাদার ভ্যাসেল’ সরাসরি বন্দরে ঢুকতে পারে না। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ও চ্যানেলের-এর গভীরতার কারণে বড় জাহাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ইউরোপ ও অন্যান্য দূরবর্তী বাজারের কন্টেইনার কার্গোর একটি বড় অংশ প্রথমে ছোট ফিডার ভ্যাসেলে করে কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট কেলাং হয়ে যায়। সেখানে বড় জাহাজে কার্গো তুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে এখনো মাঝখানে অন্য বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এত কিছুর পরও চট্টগ্রাম বন্দরের শক্তিও কম নয়। সীমাবদ্ধতা থাকলেও চট্টগ্রামকে দুর্বল বন্দর বলা যাবে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড কন্টেইনার হ্যান্ডিলিং তার সক্ষমতারই প্রমাণ। বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করেছে। নতুন টার্মিনালও যুক্ত হচ্ছে। পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। পাশাপাশি লালদিয়ার চর নিয়ে বৃহৎ পরকিল্পনা যেখানে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউ অতিরিক্ত হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি যোগ করতে পারে। আর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি হলো বে-টার্মিনাল। এটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা এবং বড় জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অর্থাৎ বাংলাদেশও বুঝতে পারছে, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক বন্দর প্রতিযোগিতায় শুধু বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকা যাবে না।
কিন্ত এরই মধ্যে নতুন করে আলোচনায় আসছে ভারতের দাদনপাত্রবাড় গভীর সমুদ্র বন্দরের পরিকল্পনা। পশ্চিমবঙ্গে বহু বছর ধরে তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা চলছিল। কিন্তু জমি ও যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমস্যায় প্রকল্পটি আর এগোয়নি। এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাজপুরের পরিবর্তে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের দাদনপাত্রবাড়কে নতুন স্থান হিসেবে বিবেচনা করছে।
দাদনপাত্রবাড়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে প্রায় ১,৭০০ একর জমি রয়েছে। সরকারের ধারণা, এই জমি ব্যবহার করে বন্দর-সংলগ্ন রেল রুটসহ নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা সহজ হতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার,দাদনপাত্রবাড় এখনো কোনো চালু গভীর সমুদ্রবন্দর নয়। এটি নতুন প্রস্তাবিত সাইট। এটা এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে আছে। বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো নিয়ে আরও কাজ বাকি। তাই এখনই এটিকে চট্টগ্রামের প্রতিদ্বন্দ্বী বলা ঠিক হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রতিযোগিতা এখানেই।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এসব রাজ্যের পণ্যকে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হলে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অনেক সহজ হতে পারে। এ কারণেই ভারত ও বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য ট্রানজিট ব্যবস্থা করেছে। ভারতের সরকারি নথিতেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে দুরত্ব,সময় এবং খরচ কমানো সম্ভব। চট্টগ্রাম থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য কয়েকটি নির্ধারিত ট্রানজিট রুটও রয়েছে। চট্টগ্রাম–আখাউড়া–আগরতলা, চট্টগ্রাম–তামাবিল–ডাউকি–মেঘালয়, চট্টগ্রাম–শেওলা–সুতারকান্দি–আসাম, এসব রুটের মাধ্যমে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের বন্দর নয়; ভবিষ্যতে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতেরও একটি রিজিওনাল গেটওয়ে হতে পারে। এখানেই দাদনপাত্রবাড়ের আসল গুরুত্ব। এখন প্রশ্নটি আরও পরিষ্কার। ভারত যদি দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করে এবং এর সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের রেল ও রোড নেটওয়ার্ক যুক্ত করতে পারে, তাহলে ভারতের সামনে একটি বিকল্প পথ তৈরি হবে। তখন সম্ভাব্য রুট হতে পারে, উত্তর-পূর্ব ভারত → ভারতের নিজস্ব সড়ক ও রেলপথ → দাদনপাত্রবাড় → বঙ্গোপসাগর → আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ। অন্যদিকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রুট, উত্তর-পূর্ব ভারত → বাংলাদেশ → চট্টগ্রাম/মাতারবাড়ি → বঙ্গোপসাগর → আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ। এখানে প্রতিযোগিতার বিষয়টি পরিষ্কার। ভারত কি নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যাতে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য আর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর করতে না হয়?
যদিও প্রশ্ন থাকে চট্টগ্রাম কি তখন পিছিয়ে পড়বে? অবশ্যই এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। কারণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের সরাসরি সংযোগ। বিশেষ করে ত্রিপুরার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের দূরত্ব অত্যন্ত কম। মেঘালয় ও আসামের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর পথ তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক।
অন্যদিকে দাদনপাত্রবাড়ে যেতে হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্যকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত নিয়ে আসতে হবে। ফলে শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর থাকলেই দাদনপাত্রবাড় চট্টগ্রামকে হারিয়ে দেবে না। ভারতকে আরও অনেক কিছু করতে হবে। তৈরি করতে হবে উন্নত রেলপথ, মহাসড়ক, কন্টেইনার টার্মিনাল, ওয়্যার হাউজ, কাস্টমস ব্যবস্থা এবং দ্রুত কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা।
তারপরও বাংলাদেশের ঝুঁকি আছে, ঝুঁকিটা চট্টগ্রামের বর্তমান ব্যবসা হারানোর চেয়ে বড়। ঝুঁকি হলো ভবিষ্যতের ব্যবসা হারানো। বাংলাদেশ এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের কার্গো-র জন্য একটি সম্ভাব্য মেরিটাইম গেটওয়ে হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ভারত যদি নিজস্ব ভূখণ্ডে একই ধরনের একটি বিকল্প তৈরি করে, তাহলে সেই বাজারে চট্টগ্রামের একচেটিয়া সুবিধা থাকবে না। অর্থাৎ আগামী দিনে ব্যবসা ভাগ হতে পারে। যে রুট কম খরচে এবং কম সময়ে কোর্গো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছে দিতে পারবে, ব্যবসা সেদিকেই যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের হাতে এই প্রতিযোগিতার জবাব দেওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি হলো মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর। চট্টগ্রামের মূল সীমাবদ্ধতা যেখানে বড় জাহাজ সরাসরি ঢুকতে না পারা, মাতারবাড়ির পরিকল্পনাই হচ্ছে বড় জাহাজ গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি করা। মাতারবাড়ি কার্যকরভাবে চালু হলে বাংলাদেশের পণ্যকে কলম্বো বা সিঙ্গাপুর-এর মতো ট্রান্সশিপমেন্ট হাব-এর ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হবে না। তখন বাংলাদেশের নিজের ডিপ সি গেটওয়ে তৈরি হবে।
আর যদি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দ্রুত ও কম খরচের ট্রানজিট ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তাহলে ভারতীয় কার্গোর-র জন্যও মাতারবাড়ি একটি প্রতিযোগিতামূলক অপশন হয়ে উঠতে পারে।
দাদনপাত্রবাড় এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে। তাই এটিকে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি বলা ঠিক হবে না। কিন্তু পরিকল্পনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তরাঞ্চলে ভবিষ্যতের বন্দর প্রতিযোগিতা শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি নিয়ে হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্য। চট্টগ্রামের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু, বন্দরে আরও কন্টেইনার নেওয়া যাবে কি না। প্রশ্ন আরও বড়, চট্টগ্রাম কি উত্তর-পূর্ব ভারতের সমুদ্রবাণিজ্যের গেটওয়ে হতে পারবে?
ভারত যদি দাদনপাত্রবাড়কে একটি কার্যকর গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কার্গো সেখানে টেনে নিতে পারে, তাহলে চট্টগ্রামের সেই আঞ্চলিক সম্ভাবনায় চাপ তৈরি হবে। যে বন্দর কম খরচে, কম সময়ে এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে পারবে,ব্যবসা শেষ পর্যন্ত সেই পথই বেছে নেবে। তাই বলা হচ্ছে, দাদনপাত্রবাড়ের পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কের কারণ নয়; বরং এটি একটি সতর্ক সংকেত। চট্টগ্রামকে এখন শুধু বাংলাদেশের প্রধান বন্দর হিসেবে নয়, বঙ্গোপসাগরের একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক গেটওয়ে হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে হবে।##

