কাজী আবুল মনসুর#
দুপুরের কড়া রোদ পেরিয়ে ঢাকা শহরের বাতাস তখন থমথমে। রাজপথে হাজারো তরুণের ভিড়। তাদের দাবিটা ছিল একেবারেই সাধারণ,মেধাকেন্দ্রিক সুযোগ ও অধিকারের দাবি। সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় বাসভবনের ঝলমলে কক্ষে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে অহংকার ভরা গলায় একটি শব্দ ছুঁড়ে দেওয়া হলো:”রাজাকার…”। ‘রাজাকার’ শব্দটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করা বাহিনীর সঙ্গে এই শব্দটি যুক্ত হওয়ায় স্বাধীনতার পর এটি বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এই শব্দটি নতুন করে জাতীয় আলোচনায় আসে। আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিবেশে শব্দটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সেটি আন্দোলনের নানা স্লোগান, প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওই বিতর্ক আন্দোলনের গতি ও জনমনে এর প্রভাব বাড়িয়ে দেয়।
ক্ষমতার উচ্চাসনে বসে ভাবা হয়েছিল, তরুণ প্রজন্মকে এই একটি অপমানজনক শব্দে তকমা লাগিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু অপমান যখন কোনো জাতির হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে, তখন তার প্রতিক্রিয়া গণিতে মাপা যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে মাঝরাতে একে একে বের হয়ে এল হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সেই রাতের অন্ধকারে শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনিত হলো এক অভূতপূর্ব উল্টো স্লোগান: “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!”
একটি গালি কীভাবে অধিকার আদায়ের বর্ম হয়ে ওঠে, ইতিহাস সেদিন তা দেখেছিল। অহংকারের মাধ্যমে নিক্ষিপ্ত একটিমাত্র শব্দ পরিণত হলো এমন এক গণবিপ্লবে, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আস্ত এক স্বৈরাচারী শাসনের তাসের ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।
ভারতে ২০২৬ সালে আলোচনায় আসে আরেকটি শব্দ—‘ককরোচ’। আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দিপকে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে Cockroach Janta Party (CJP)-এর ধারণা সামনে আনেন। দ্রুতই #MainBhiCockroach স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে। বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারি নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে ক্ষুব্ধ অনেক তরুণ এই প্রতীককে গ্রহণ করেন। প্রথমে এটি ছিল একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ। পরে দিল্লির যন্তর মন্তরসহ বিভিন্ন স্থানে বাস্তব সমাবেশেও এর উপস্থিতি দেখা যায়।ইতিহাসের পৃষ্ঠা একটু উল্টালে বা সীমানা পেরিয়ে তাকালে দেখা যায় ক্ষমতার ভাষা সব জায়গায় প্রায় এক। সেখানেও কোনো কোনো আন্দোলনের সময় সাধারণ মানুষকে বা প্রতিবাদীদের তুলনা করা হয়েছিল ক্ষতিকারক বা নগণ্য কোনো পতঙ্গের সাথে, “ককরোচ” বা তেলাপোকা।
ভারতের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গণআন্দোলনের ইতিহাসে রাজপথ যখন উত্তাল হতো, তখন প্রায়শই সুবিধাবাদী বা দমনকারী শ্রেণি সাধারণ মানুষকে বলত, “এরা তো কেবল রান্নাঘরের দেয়াল ঘেঁষে হেঁটে যাওয়া তেলাপোকার দল, সামান্য চাপ দিলেই পিষে যাবে।” কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, দেয়ালের কোণে জমতে থাকা এই ‘অদৃশ্য’ মানুষগুলোই রাষ্ট্রের আসল ভিত্তি।যখন তরুণ, কৃষক আর শ্রমিকরা বুঝে ফেলল যে তাদেরকে মানুষ নয়, বরং পিষে ফেলার মতো ‘কীটপতঙ্গ’ বলে গণ্য করা হচ্ছে, তখন সেই অবমাননাই তাদের ক্ষোভের চরম আগুনে ঘি ঢালল। রাজধানী অভিমুখে আসা মিছিলের ব্যানারে লিখে দেওয়া হলো:”আমরা যদি পোকামাকড় হই, তবে মনে রেখো,ইটের ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা এই অনাহারী হাতগুলোরই আছে।”রাজপথ স্থবির হয়ে গেল। যে শব্দ দিয়ে স্তব্ধ করতে চাওয়া হয়েছিল, সেই শব্দই কোটি কোটি শোষিত মানুষকে এক ছাদের নিচে এনে এক বিশাল ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তুলল।
দুই দেশের ঘটনায় কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, একটি শব্দ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই শব্দকে দ্রুত লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। তৃতীয়ত, তরুণদের একটি অংশ শব্দটিকে নিজেদের প্রতিবাদের ভাষায় রূপান্তর করে। চতুর্থত, শব্দটি কেবল অভিধানের অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে ওঠে। এই দুই ঘটনাকে একই কাতারে ফেলা যাবে না। বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ একটি ঐতিহাসিক শব্দ, যার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, জাতীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্যদিকে ভারতে ‘ককরোচ’ একটি নতুন প্রতিবাদী প্রতীক, যা মূলত বেকারত্ব, নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং তরুণদের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অংশ। দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের লক্ষ্য এবং পরিণতিও আলাদা।
শব্দ কেবল ভাষার অংশ নয়; শব্দ হলো ক্ষমতার অহংকার আর জনমানুষের ক্ষোভের পরিমাপক। বাংলাদেশ ও ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয়: শাসকের ছুড়ে দেওয়া একটি অপমানজনক শব্দ জনমানুষের হৃদয়ে ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে। আন্দোলনকারীরা সেই শব্দকেই তুলে নিয়ে নিজেদের বিপ্লবী স্লোগানে রূপান্তর করে। শেষপর্যন্ত হাজার মানুষের পায়ের আওয়াজে অহংকারের সেই দেয়াল ধসে পড়ে।
শব্দের নিজস্ব কোনো ওজন থাকে না। কিন্তু একটি স্বৈরাচারী বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা একটিমাত্র শব্দ কীভাবে লাখো জনতার ক্ষোভকে গণবিস্ফোরণে রূপ দিতে পারে, তার ইতিহাস বাংলাদেশ ও ভারত,উভয় ভূখণ্ডেই অত্যন্ত জীবন্ত।
রাজনীতির ইতিহাস বলছে, অনেক সময় একটি মাত্র শব্দ, একটি বাক্য বা একটি মন্তব্য এমন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা বক্তার প্রত্যাশারও বাইরে চলে গেছে। কোনো আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই হয়তো সমাজে ক্ষোভ জমে থাকে; একটি বিতর্কিত শব্দ তখন সেই ক্ষোভ প্রকাশের অনুঘটক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ভারতে ‘ককরোচ’ শব্দকে ঘিরে তরুণদের একটি অংশ সেটিকেই প্রতিবাদের প্রতীকে রূপান্তর করেছে। দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, শব্দ কখনও কখনও কেবল শব্দ থাকে না; তা রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী মত, প্রতিবাদকারী বা নাগরিকদের সম্পর্কে ব্যবহৃত ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবমাননাকর বা বিতর্কিত শব্দ অনেক সময় সমালোচনাকে স্তব্ধ করে না; বরং উল্টো সেই শব্দই আন্দোলনের স্লোগান, পরিচয় এবং প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
তাই ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জনজীবনে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা রাজনীতিক, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা জনপরিসরের যে কোনো প্রভাবশালী কণ্ঠের বক্তব্যে সংযম, দায়িত্ববোধ এবং ভাষার সচেতন ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শব্দ কখন কোথায় কী ধরনের সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে, তা আগে থেকে অনুমান করা সবসময় সম্ভব হয় না।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এই বার্তাটুকু স্পষ্ট করে—ক্ষমতার ভাষা যত শক্তিশালী, তার প্রতিক্রিয়াও তত গভীর হতে পারে। তাই শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা শুধু শিষ্টাচারের বিষয় নয়; এটি অনেক সময় রাজনৈতিক প্রজ্ঞারও পরিচয়।##

