-- বিজ্ঞাপন ---

চীন-পাকিস্তান মোকাবিলায় বিমান শক্তি বাড়াচ্ছে ভারত, আসছে ১১৪ নতুন যুদ্ধবিমান

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান##

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে নতুন করে মোট ১১৪টি অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার এয়ারক্রাফট (Multirole Fighter Aircraft) সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রাথমিকভাবে ৩.২৫ ট্রিলিয়ন রুপি বা প্রায় ৩৪.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল তহবিল বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মূলত ‘মেইক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির আলোকে পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রান্সের দাসোঁ অ্যাভিয়েশন কর্পোরেশনের কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে মোট ১১৪টি নতুন মাল্টিরোল রাফাল (F4 ভ্যারিয়েন্ট) যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।

ভারতের বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের তৈরি ৩৬টি মাল্টিরোল রাফাল যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যেই সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪-২৫ সালের দিকে নতুন আরও ২৬টি রাফাল-এম নৌবাহিনী সংস্করণের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এসব বিমানের সরবরাহ এখনো শুরু হয়নি।

NDTV-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় বিমান বাহিনীর অনুমোদিত স্কোয়াড্রনের সংখ্যা ৪২টি। কিন্তু বর্তমানে তাদের হাতে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ২৯টি স্কোয়াড্রন। মিগ-২১-এর মতো পুরোনো যুদ্ধবিমান অবসরে চলে যাওয়ায় এই ঘাটতি আরও বেড়েছে। এ কারণেই ভারত নতুন করে ১১৪টি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এদিকে, ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত মোট ১৪১টি HAL Tejas Mark-1A যুদ্ধবিমান সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও নতুন বিমানগুলোর সরবরাহ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে দেশটির স্কোয়াড্রন ঘাটতি পূরণে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে প্রায় ৩০-৩৫টি এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট তেজাস (Mark-1) লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট অপারেশনাল রয়েছে।

চীন ও পাকিস্তানকে আকাশপথে কার্যকরভাবে মোকাবিলা এবং একটি বিশ্বমানের বিমান বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় এক দশক আগে থেকেই ভারত ব্যাপক আধুনিকায়ন কর্মসূচি শুরু করে। তবে দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত যুদ্ধবিমানের উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত সরকার সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। এর আওতায় বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে ভারতের বিমান বাহিনীর বহরে থাকা পুরোনো মিগ-২১ যুদ্ধবিমানগুলো অবসরে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বহরে থাকা সব জাগুয়ার যুদ্ধবিমানকে ব্যাপকভাবে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব বিমানকে আরও প্রায় এক যুগ সক্রিয় সেবায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে দেশটির বিমান বাহিনীর।

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের Fighter Fleet Strength by Country (2026) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিমান বাহিনীর সক্রিয় কমব্যাট এয়ারক্রাফটের সংখ্যা বর্তমানে ৪৭৬টি। তুলনামূলকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১,৭৯১টি, চীনের ১,৪৪৩টি, রাশিয়ার ৮৬১টি এবং পাকিস্তানের ৩৩১টি সক্রিয় কমব্যাট এয়ারক্রাফট।

উইকিপিডিয়ার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান হিসেবে রয়েছে ২৫৮টি Su-30MKI মাল্টিরোল হেভি ফাইটার (এছাড়া আরও ১২টি অর্ডার করা হয়েছে)। যদিও বিমানটি মূলত রাশিয়ার তৈরি, ভারত নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী এতে দেশীয় অস্ত্র, উন্নত সেন্সর এবং বিভিন্ন পশ্চিমা প্রযুক্তি সংযোজন করেছে।

বর্তমানে ভারতের বিমান বাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান হলো ফ্রান্সের তৈরি ৪++ প্রজন্মের রাফাল, যার সংখ্যা ৩৬টি। এছাড়া রয়েছে ৫৯টি মিগ-২৯, বিভিন্ন সংস্করণের ৩৬টি মিরাজ-২০০০, এবং ৮৬টি জাগুয়ার যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে রয়েছে ৩৫টি ক্যারিয়ারভিত্তিক মিগ-২৯কে যুদ্ধবিমান।

২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতের সামরিক বিমান বহরে নতুন ৩৬টি রাফাল, ৩০-৩৫টি HAL Tejas, ২২টি Apache AH-64E কমব্যাট হেলিকপ্টার এবং ১২টি P-8I Neptune সামুদ্রিক টহল ও সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধবিমান যুক্ত হয়েছে। তবে একই সময়ে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সে (PLAAF) প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০০টি করে কমব্যাট ও নন-কমব্যাট এয়ারক্রাফট যুক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভারতকে নতুন প্রজন্মের F-35 স্টেলথ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের প্রস্তাব দিলেও বাস্তবে ভারতীয় বিমান বাহিনী রাশিয়ার তৈরি Su-57 পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

তবে এটাও সত্য যে, দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক বৈরিতা ও সীমান্ত উত্তেজনার কারণে ভারতের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীন হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত নয়। বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চীন।

আর ঠিক এই বিষয়টিই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। চীনকে মোকাবিলার লক্ষ্যে সমগ্র এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।