লুবিয়াঙ্কার বন্ধ দরজার ওপারে যেভাবে তৈরি হতো বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর গুপ্তচর নেটওয়ার্ক(কেজিবি-২য় পর্ব)
কাজী আবুল মনসুর#
মস্কোর কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটা হলুদ রঙের বিশাল দালান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ কোনো সরকারি ভবন। কিন্তু এই দালানের নাম শুনলেই সোভিয়েত যুগে মানুষের বুক কেঁপে উঠত—লুবিয়াঙ্কা। এখানেই ছিল কেজিবির সদর দপ্তর। মস্কোবাসীদের মধ্যে একটা কালো রসিকতা প্রচলিত ছিল—”লুবিয়াঙ্কা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দালান, কারণ এখান থেকেই সাইবেরিয়া দেখা যায়”—ইঙ্গিত ছিল, একবার এই দালানে ঢুকলে পরের ঠিকানা হতো গুলাগের বরফে ঢাকা শ্রমশিবির।
কিন্তু এই ভয়ংকর দালানের ভেতরে যা ঘটত, তার বেশিরভাগটাই ছিল নিছক আটক-নির্যাতনের গল্প নয়। এখানেই বসে পরিকল্পনা হতো এমন এক নেটওয়ার্কের, যা পরবর্তী চার দশকে ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন, বার্লিন থেকে দিল্লি—পৃথিবীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজকের পর্বে আমরা ঢুকব সেই বন্ধ দরজার ওপারে।
প্রথম ধাপ: মানুষ চেনা, মানুষ বাছাই করা
কেজিবির শক্তির আসল রহস্য ছিল একটাই কথায়—তারা জানত, একজন মানুষকে কীভাবে ভাঙতে হয়, আর কীভাবে জিততে হয়। গুপ্তচর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরেই, একেবারে তরুণ বয়স থেকে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কমসোমল (কমিউনিস্ট যুব সংগঠন)—এই প্রতিটি জায়গায় ছড়িয়ে থাকত কেজিবির নিঃশব্দ পর্যবেক্ষকেরা। তারা খুঁজত এমন তরুণ-তরুণীদের, যাদের মধ্যে তিনটি জিনিস একসঙ্গে মিলত—তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, নিখুঁত আনুগত্য, আর মানসিক দৃঢ়তা। ভাষার প্রতিভা থাকলে বাড়তি সুবিধা, কারণ তাদের হয়তো পাঠানো হবে বহু বছর ধরে বিদেশের মাটিতে, সম্পূর্ণ অন্য এক পরিচয়ে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর আর কার্যকর কৌশলটা ছিল ভিন্ন—কেজিবি নিজের দেশের নাগরিক নয়, বরং বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ করার শিল্পে হয়ে উঠেছিল রীতিমতো ওস্তাদ। এর জন্য তারা তৈরি করেছিল একটা পদ্ধতি, যাকে গোয়েন্দা মহলে ডাকা হয় MICE—Money (অর্থ), Ideology (আদর্শ), Coercion (জবরদস্তি/ব্ল্যাকমেইল), এবং Ego (অহংকার)। একজন লক্ষ্যবস্তুকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হতো—তার ঋণের বোঝা কতটা, তার বিয়েতে অশান্তি আছে কি না, সে নিজের কর্মজীবনে অবহেলিত বোধ করে কি না, নাকি তার মনে কমিউনিজমের প্রতি সত্যিকারের সহানুভূতি আছে। এই দুর্বলতার সুতো ধরেই ধীরে ধীরে টেনে আনা হতো তাকে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৩০-এর দশকে নিয়োগ করা সেই কুখ্যাত কেমব্রিজ ফাইভ-এর গল্প এই কৌশলেরই সবচেয়ে বড় উদাহরণ—তরুণ, আদর্শবাদী, উচ্চাভিলাষী ব্রিটিশ ছাত্ররা, যারা কমিউনিজমকে বিশ্বাস করে নিজেদের দেশের সবচেয়ে গোপন তথ্য তুলে দিয়েছিল মস্কোর হাতে। এই গল্প আমরা বিস্তারিত জানব পরের কোনো পর্বে।
দ্বিতীয় ধাপ: যেখানে গড়ে তোলা হতো “নিখুঁত মিথ্যা মানুষ”
একজন মানুষকে বাছাই করার পর শুরু হতো আসল কাজ—তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা। মস্কোর বাইরে, নজর এড়িয়ে থাকা কয়েকটি গোপন স্থাপনায় চলত এই প্রশিক্ষণ। সবচেয়ে পরিচিত ছিল আন্দ্রোপভ ইনস্টিটিউট (পরবর্তীতে এই নামে পরিচিত, প্রথম প্রধান কেজিবি চেয়ারম্যান ইউরি আন্দ্রোপভের নামে), যেখানে কেজিবির বিদেশি গোয়েন্দা শাখা—ফার্স্ট চিফ ডিরেক্টরেট-এর ভবিষ্যৎ অফিসারদের গড়ে তোলা হতো।
প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ছিল রীতিমতো এক গোয়েন্দা-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম—
ভাষা ও সংস্কৃতি: একজন প্রশিক্ষণার্থীকে এমনভাবে গড়ে তোলা হতো যেন সে ইংরেজি, জার্মান বা ফরাসি বলতে পারে কোনো উচ্চারণ-ত্রুটি ছাড়াই, আর টার্গেট দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, এমনকি খেলাধুলার খুঁটিনাটি পর্যন্ত জানত যেন সে সেখানকারই মানুষ।
ছদ্মবেশ ও নজরদারি এড়ানো: কীভাবে বোঝা যায় কেউ পিছু নিয়েছে কি না, কীভাবে “ডেড ড্রপ” (গোপন স্থানে বার্তা রেখে যাওয়া, সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়াই যোগাযোগ) ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে গোপন কালি বা মাইক্রোফিল্মে বার্তা লুকাতে হয়।
মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ: জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কীভাবে নিজের গল্পে অটল থাকতে হয়, কীভাবে মিথ্যা পরিচয়ে বছরের পর বছর বাস করেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।
অস্ত্র ও কারিগরি প্রশিক্ষণ: প্রয়োজনে আত্মরক্ষা, আর প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রাথমিক দক্ষতা।
এই প্রশিক্ষণের সবচেয়ে চমকপ্রদ আর ভয়ংকর অংশ ছিল “ইলিগ্যালস প্রোগ্রাম” (Illegals Program)। এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে তারা কোনো দূতাবাস বা কূটনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়া ছাড়াই, সম্পূর্ণ ভুয়া এক পরিচয় নিয়ে বিদেশে গিয়ে বসবাস করতে পারে—কখনো কখনো দশ, পনেরো, এমনকি বিশ বছর ধরে। এই এজেন্টদের বলা হতো “ইলিগ্যালস”। তারা বিয়ে করত, সন্তান জন্ম দিত, প্রতিবেশীর সঙ্গে বারবিকিউ পার্টিতে যোগ দিত—অথচ তাদের আসল নাম, আসল ইতিহাস, আসল পরিচয় ছিল মস্কোর এক নথিতে তালাবদ্ধ। প্রতিবেশী, এমনকি নিজের সন্তান পর্যন্ত জানত না যে তাদের বাবা বা মা আসলে কে।
তৃতীয় ধাপ: নেটওয়ার্ক যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে
একবার প্রশিক্ষণ শেষ হলে এই এজেন্টদের পাঠানো হতো পৃথিবীর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে। প্রতিটি বড় সোভিয়েত দূতাবাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকত একটা “রেসিডেন্তুরা” (Rezidentura)—কেজিবির স্থানীয় কার্যালয়, যার নেতৃত্বে থাকতেন একজন “রেসিডেন্ত”, অর্থাৎ সেই শহরের গোয়েন্দা প্রধান। বাইরে থেকে তিনি হয়তো একজন সাধারণ বাণিজ্যিক অ্যাটাশে বা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা—কিন্তু তাঁর আসল কাজ ছিল স্থানীয় এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ করা, নতুন লোক নিয়োগ করা, আর মস্কোয় তথ্য পাঠানো।
এই নেটওয়ার্কের স্তরবিন্যাস ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল:
কেজিবি অফিসার: সরাসরি কেজিবির বেতনভুক্ত কর্মকর্তা, প্রায়ই কূটনৈতিক ছদ্মবেশে।
এজেন্ট বা সোর্স: স্থানীয় নাগরিক, যারা তথ্য সরবরাহ করত—কখনো টাকার বিনিময়ে, কখনো আদর্শের টানে, কখনো ব্ল্যাকমেইলের চাপে।
ইলিগ্যাল: গভীরভাবে প্রোথিত গোপন এজেন্ট, যাদের কথা আগেই বলা হয়েছে।
কুরিয়ার ও কন্ট্যাক্ট: যারা এই বিশাল নেটওয়ার্কের মধ্যে তথ্য আর নির্দেশনা আদান-প্রদান করত, প্রায়ই না জেনেই যে তারা কার হয়ে কাজ করছে।
এই পুরো ব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো ছিল যে, একটা লিংক ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকত—প্রতিটি এজেন্ট শুধু তার ঠিক ওপরের আর নিচের যোগাযোগটুকু জানত, পুরো ছবিটা জানতেন শুধু মস্কোয় বসে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন।
আর ঠিক এই সাংগঠনিক নিখুঁততা, এই ধৈর্য, আর মানুষের দুর্বলতা পড়ার এই দক্ষতাই কেজিবিকে করে তুলেছিল ইতিহাসের অন্যতম কার্যকর—এবং অন্যতম ভয়ংকর—গোয়েন্দা যন্ত্র।#

