-- বিজ্ঞাপন ---

আরএস-২৮: রাশিয়ার কৌশলগত অস্ত্র নাকি অতিরঞ্জিত প্রচারণা?

সিরাজুর রহমান#
বর্তমানে চলমান মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত অস্ত্র সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। আর এই প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার অন্যতম আলোচিত অস্ত্র হলো আরএস-২৮ সারমাত (RS-28 Sarmat) ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল (ICBM)।
পশ্চিমা বিশ্বে এটি “সাতান-২” (Satan-2) নামেও পরিচিত। আর সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক কিছু গণমাধ্যমে প্রচারিত এই মিসাইলের সফল পরীক্ষা ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়ার তৈরি আরএস-২৮ সারমাত (আইসিবিএম) মূলত সোভিয়েত আমলের আরএস-৩৬এম (R-36M Voyevoda) বা এসএস-১৮ স্যাটান মিসাইলকে প্রতিস্থাপনের জন্য ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে। এটিকে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল ফোর্সের আধুনিকীকরণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আরএস-২৮ (আইসিবিএম) হলো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আইসিবিএমগুলোর মধ্যে অন্যতম। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, এই মিসাইলের রেঞ্জ হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার কিলোমিটার। তবে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মনে করেন, এর বাস্তব কার্যকর পাল্লা প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার কিলোমিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
আসলে, পৃথিবীর পরিধি প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার হওয়ায় বাস্তবে এত বিশাল রেঞ্জের ইন্টারকন্টিন্যান্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইলের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই অনেকের মতে, এই মিসাইলের রেঞ্জ সংক্রান্ত কিছু দাবি রাশিয়ার নিজস্ব কৌশলগত প্রচারণা কিংবা হয়তো প্রোপাগান্ডার অংশও হতে পারে।
এই মিসাইলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি এমআইআরভি (MIRV: Multiple Independently Targetable Reentry Vehicle) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অর্থাৎ একটি মিসাইল থেকেই ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড নিক্ষেপ করা সম্ভব।
এছাড়াও এতে উচ্চ প্রযুক্তির হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল সংযুক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়, যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সুনির্দিষ্ট টার্গেটে আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও বাস্তব যুদ্ধে এখনো পর্যন্ত এই প্রযুক্তি ব্যবহারের নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে, রাশিয়ার তরফে যাই দাবি করা হোক না কেন, নতুন উম্মোচিত আরএস-২৮ (আইসিবিএম) মিসাইলকে ঘিরে কিছু সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সারমাত মিসাইলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ব্যার্থ হয় কিংবা সম্পূর্ণ সফল হয়নি।
কিছু পরীক্ষায় এর প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং উৎক্ষেপণ ব্যর্থতার খবরও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। যদিও রাশিয়া এ বিষয়ে খুবই সীমিত তথ্য প্রকাশ করেছে। আর এদিকে, পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, এত জটিল ও ভারী মিসাইলকে নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালনা করা প্রযুক্তিগতভাবে যথেষ্ট কঠিন ও ব্যয়বহুল একটি কাজ হবে।
এছাড়া, এখন আধুনিক যুদ্ধে শুধুমাত্র অত্যন্ত শক্তিশালী (আইসিবিএম) মিসাইল থাকলেই কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত হয় না। বর্তমানে স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার যুদ্ধ, অ্যান্টি-মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, সাবমেরিনভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যার ফলে রাশিয়া এখন তার আরএস-২৮ সারমাত (আইসিবিএম) মিসাইলকে যতই শক্তিশালী হিসেবে প্রচার করুক না কেন, এটি অদুর ভবিষ্যতে এককভাবে বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্য পুরোপুরি পরিবর্তন করে ফেলবে, এমন ধারণা বা ক্রেমিলিনের দাবি হয়তো বাস্তবসম্মত নয়।
তবে এটিও সত্য যে, নতুন প্রজন্মের আরএস-২৮ সারমাত রাশিয়ার পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (nuclear deterrence) আরও আধুনিক ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অস্ত্র প্রতিযোগিতায় রাশিয়া এই ধরনের অস্ত্রকে বৈশ্বিক পর্যায়ে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
তথ্যসূত্র: RT, Reuters, CSIS Missile Defense Project, Wikipedia, Arms Control Association।