সিরাজুর রহমান#
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদন পেলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে প্রথম বারের মতো হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এক্ষেত্রে মার্কিন বিমান বাহিনী খুব সম্ভবত তাদের নতুন প্রজন্মের এয়ার লঞ্চ বেসড হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েন ও ব্যবহার করতে পারে।
আসলে, বর্তমানে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া এবং ইরান তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহারের দাবি করলেও বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এখনো পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করতে পারেনি। তবে এই অভাবনীয় উচ্চ প্রযুক্তির হাইপারসনিক মিসাইল টেকনোলজি উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭-৮টি দেশ হাইপারসনিক মিসাইল টেকনোলজি নিয়ে বিগত এক দশক থেকে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইরান, ভারত, তুরস্ক ও উত্তর কোরিয়া এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণায় সফলতা অর্জন করেছে বলে দাবি করা হয়।
হাইপারসনিক মিসাইল টেকনোলজি হলো এমন এক ধরনের অত্যন্ত দ্রুতগতির মিসাইল সিস্টেম, যা শব্দের গতির চেয়ে অন্তত ৫ গুণ বেশি (Mach 5+) গতিতে এবং প্রয়োজনে দ্রুত দিক পরিবর্তন করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে গ্লাইড করতে সক্ষম, যা প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Defense System) দ্বারা প্রতিহত করা খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়ে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘর্ষে ইরান তার নিজস্ব প্রযুক্তির বেশকিছু মডেলের উচ্চগতির মিসাইল উন্মোচন করে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা উন্নত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের কয়েক স্তরের বাধা অতিক্রম করে ইরানের বেশকিছু ফাতাহ-১/২ সিরিজের ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জের হাইপারসনিক মিসাইল টার্গেটে আঘাত হানে।
ইরানের ফাতাহ-২ সিরিজের হাইপারসনিক মিসালের রেঞ্জ হলো প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার এবং দাবি করা হয়, টার্মিনাল ফেজে এর গতি হতে পারে আনুমানিক ম্যাক ১০-১৩ বা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার। তবে, এই জাতীয় মিসাইল তার ফ্লাইট পাথ-এ পুরো সময় হাইপারসনিক গতি অর্জন করে না।
এদিকে গত ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া তার নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি অত্যাধুনিক ৯ ম্যাক গতি সম্পন্ন এয়ার লঞ্চড বেসড কেএইচ-৪৭এম২ (কিনঝাল) এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে ‘জিরকন’ হাইপারসনিক মিসাইল নিক্ষেপ করে সারা বিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, এই মিসাইলের গতি ছিল কিনা অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ম্যাক ৯ বা ১১,১৮৩ কিলোমিটার।
চীন তৈরি করেছে নিজস্ব প্রযুক্তির ডিএফ-১৭ হাইপারসনিক মিসাইল, যা ম্যাক ৫-১০ গতির DF-ZF গ্লাইড ভেহিকল ব্যবহার করে বলে দাবি করা হয়। আবার প্রায় ম্যাক ৬ গতির ক্যারিয়ার কিলার খ্যাত ওয়াইজে-২১ এন্টিশিপ মিসাইল, যা শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে হাইপারসনিক গ্লাইড বডি (সি-এইচজিবি) সিস্টেম। যার গতি হবে কিনা অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ১৭.০ ম্যাক বা তার কাছাকাছি। যদিও আমেরিকার সামরিক বাহিনীর এই প্রযুক্তি অর্জনে বিনিয়োগের বিপরীতে বাস্তব সাফল্য হয়ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে।
গত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পেন্টাগন’ জানায় যে, ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে “ডার্ক ঈগল” নামে পরিচিত লং-রেঞ্জ হাইপারসনিক ওয়েপন (LRHW) সিস্টেমের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এটি ছিল আসলে গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সফলতার পর দেশটির দ্বিতীয় সফল পরীক্ষা।
ইউএস এয়ারফোর্স বর্তমানে লকহিড মার্টিন কর্পোরেশনের তৈরি নতুন প্রজন্মের এজিএম-১৮৩এ এয়ার লঞ্চড বেসড হাইপারসনিক মিসাইল নিয়ে কাজ করছে। যদিও গত ২০২৩ সালের মার্চ মাসে প্রোগ্রামটি বাতিল করার তথ্য বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশিত হলেও বাস্তবে পরবর্তীতে এর বেশকিছু সফল পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটির বিমান বাহিনী।
ভারত সম্প্রতি (মে ২০২৬) ওড়িশা উপকূলের এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে ১,৫০০ কিলোমিটার রেঞ্জের হাইপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইলের (LRAShM) সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ডিআরডিও (DRDO) কর্তৃক তৈরি (two-stage) স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন (Scramjet engine) চালিত এই মিসাইল শব্দের গতির চেয়ে ৫ গুণ (Mach 5+) দ্রুত গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
গত ২০২৫ সালের দিকে IDEF প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে তুরস্ক তাদের টাইফুন (Typhoon) ব্লক-৪ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে। তাছাড়া চলতি ২০২৬ সালের মধ্যে তুরস্ক ব্যাপক উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। টাইফুন ব্লক-৪ আসলে তুরস্কের দীর্ঘ-পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল পরিবারের হাইপারসনিক সংস্করণ, যা উড্ডয়নের বেশিরভাগ সময়েই ম্যাক ৫-এর বেশি গতিবেগ বজায় রাখতে সক্ষম।
উত্তর কোরিয়াও এবার হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিতে অগ্রগতির দাবি করেছে। গত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তারা হোয়াসং-১৬বি মিসাইলে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল যুক্ত করে পরীক্ষা সম্পন্ন করে। দাবি করা হয় এটি প্রায় ম্যাক ১২ গতিতে চলতে পারে এবং প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম।
পরিশেষে বলা যায়, এই অতি উচ্চ প্রযুক্তির হাইপারসনিক গতির মিসাইল সিস্টেম ডিজাইন এণ্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের পাশাপাশি ইরান, ভারত এবং উত্তর কোরিয়া অনেকটাই এগিয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে একেবারেই প্রথম রাশিয়া ও ইরান এই জাতীয় অস্ত্রের প্রয়োগ করে বিশ্বকে এক অভাবনীয় হাইপারসনিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।##

