-- বিজ্ঞাপন ---

নয়াদিল্লির কি এই যন্তর মন্তর: যেখানে প্রতিবাদের ইতিহাস লেখা হয়

কাজী আবুল মনসুর#

দিল্লির ব্যস্ত কনট প্লেস থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। একদিকে শত শত বছরের পুরোনো এক স্থাপনা, যেখানে একসময় সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের গতি নির্ণয়ে ব্যবহৃত হতো বিশাল পাথরের বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। অন্যদিকে সেই একই স্থানের সামনে এখন বেকার তরুণ, শিক্ষার্থী, কৃষক, ক্রীড়াবিদ কিংবা বিভিন্ন পেশার মানুষের স্লোগানে মুখরিত প্রতিবাদ। সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party-CJP)’ নামের নতুন এক আন্দোলনের কারণে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর। আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেকারত্ব, সরকারি চাকরির নিয়োগে অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমাবেশস্থলও হয়ে উঠেছে যন্তর মন্তর।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতে নতুন কোনো আন্দোলন হলেই কেন বারবার ফিরে আসে এই যন্তর মন্তরের নাম? কী আছে এই স্থানে, যা একে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছে? উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রায় তিনশ বছর আগের মুঘল আমলে।

১৭২৪ সালে জয়পুরের শাসক সাওয়াই জয় সিং দ্বিতীয় দিল্লিতে যন্তর মন্তর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তিনি শুধু একজন রাজা ছিলেন না, জ্যোতির্বিজ্ঞানেরও একজন অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময় ব্যবহৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণিগুলোর মধ্যে নানা অসঙ্গতি লক্ষ্য করে তিনি আরও নির্ভুল পর্যবেক্ষণের জন্য বিশাল আকারের স্থায়ী পাথরের যন্ত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।সংস্কৃত শব্দ ‘যন্ত্র’ অর্থ যন্ত্র বা পরিমাপক এবং ‘মন্ত্র’ শব্দটির একটি অর্থ গণনা বা সূত্র। এই দুই শব্দের সমন্বয় থেকেই এসেছে ‘যন্তর মন্তর’ নামটি। এখানে নির্মিত বিশাল আকারের বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে সূর্যের অবস্থান, সময়, নক্ষত্রের গতি এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নানা হিসাব নির্ণয় করা হতো। দিল্লির পাশাপাশি জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারাণসী ও মথুরাতেও একই ধরনের মানমন্দির নির্মাণ করেন সাওয়াই জয় সিং দ্বিতীয়। এর মধ্যে জয়পুরের যন্তর মন্তর বর্তমানে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।

প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যন্তর মন্তর ছিল মূলত একটি ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক স্থাপনা। পর্যটকরা এখানে আসতেন স্থাপত্য ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার জন্য। রাজনীতি বা জনআন্দোলনের সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতার পর ভারতের রাজধানী দিল্লি ধীরে ধীরে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া জানানোর জন্য রাজধানীতে একটি নির্দিষ্ট স্থানের প্রয়োজন দেখা দেয়।

প্রথমদিকে অধিকাংশ বড় সমাবেশ হতো বোট ক্লাব এলাকায়। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে বিশাল কৃষক সমাবেশসহ কয়েকটি বড় আন্দোলনের পর প্রশাসন নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনা করতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে দিল্লি প্রশাসন ধীরে ধীরে যন্তর মন্তর এলাকাকে নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ ছিল। প্রথমত, এটি সংসদ ভবন ও কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের খুব কাছাকাছি। ফলে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছ থেকেই নিজেদের দাবি তুলে ধরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, এলাকা তুলনামূলক ছোট হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। তৃতীয়ত, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আন্দোলনকারীদের জন্য এটি সহজে পৌঁছানোর মতো একটি স্থান। ক্রমে ক্রমে এই বাস্তব সিদ্ধান্তই যন্তর মন্তরকে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করে।

গত তিন দশকে ভারতের বহু আলোচিত আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে যন্তর মন্তর। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে আন্না হাজারের অনশন, কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ, কুস্তিগীরদের প্রতিবাদ, শিক্ষার্থী আন্দোলন, প্রতিটি ঘটনাই যন্তর মন্তরের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হলেও খুব দ্রুত এটি বাস্তব সমাবেশে রূপ নেয়। ‘আমিও ককরোচ’—এই স্লোগান নিয়ে বহু তরুণ যন্তর মন্তরে জড়ো হন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা তরুণ সমাজকে হতাশ করে তুলেছে। ‘ককরোচ’ শব্দটিকেই তারা প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছেন।

এভাবেই তিনশ বছর আগে নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য নির্মিত একটি মানমন্দির আজ ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্পট। দিল্লির যন্তর মন্তরের ইতিহাসে এমন অনেক দিন এসেছে, যখন হাজারো মানুষের স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। স্বাধীনতার পর থেকে অসংখ্য আন্দোলন, অনশন, প্রতিবাদ এবং গণদাবির সাক্ষী এই ঐতিহাসিক স্থান। ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চায় যন্তর মন্তর শুধু একটি ঠিকানা নয়, বরং জনমতের প্রতীক হিসেবেই পরিচিত।

গত তিন দশকে দেশের বহু আলোচিত আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল যন্তর মন্তর। ২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারে দুর্নীতিবিরোধী জনলোকপাল আইনের দাবিতে এখানেই অনশন শুরু করেন। সেই আন্দোলন সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং পরবর্তীতে ভারতের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। ২০১২ সালে দিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে যন্তর মন্তর আবারও মানুষের প্রতিবাদের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এরপর তামিলনাড়ুর কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ, অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ আন্দোলন এবং ভারতের শীর্ষ নারী কুস্তিগীরদের আন্দোলন—সবই কোনো না কোনো সময় যন্তর মন্তরকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

২০২৬ সালে আবারও আলোচনায় আসে যন্তর মন্তর। এবার কারণ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party-CJP)।আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা খুব দ্রুত বাস্তব আন্দোলনে রূপ নেয়। ‘আমি ককরোচ’—এই স্লোগান নিয়ে বহু তরুণ যন্তর মন্তরে জড়ো হন। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, সরকারি চাকরির অনিশ্চয়তা, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস তরুণদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। প্রতিবাদকারীদের কাছে ‘ককরোচ’ অপমানের প্রতীক নয়; বরং অবহেলিত, উপেক্ষিত অথচ টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা মানুষের পরিচয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যন্তর মন্তরের সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রতীকী গুরুত্ব। এখানে কোনো আন্দোলন হলে তা খুব দ্রুত জাতীয় সংবাদে পরিণত হয়। সংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গণমাধ্যমের দপ্তর কাছাকাছি হওয়ায় আন্দোলনের বার্তা দ্রুত সারা দেশে পৌঁছে যায়। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গত কয়েক বছরে দিল্লি প্রশাসন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া সমাবেশ বন্ধ করা হয়েছে। এরপরও নতুন কোনো জাতীয় ইস্যু সামনে এলেই যন্তর মন্তরের নাম আবার আলোচনায় ফিরে আসে।

তিনশ বছর আগে সাওয়াই জয় সিং দ্বিতীয় এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য। কিন্তু সময়ের প্রবাহে যন্তর মন্তরের পরিচয় বদলে গেছে। আজ এখানে শুধু সময় মাপা হয় না; মাপা হয় জনমতের স্পন্দন, মানুষের ক্ষোভ, প্রত্যাশা এবং প্রতিবাদের শক্তি। সেই কারণেই ভারতের নতুন প্রজন্মের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠা ‘ককরোচ’ আন্দোলনও শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সাময়িক প্রতিবাদ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি ভারতের তরুণ সমাজের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেবে—সেটি এখনই বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। তিনশ বছরের ইতিহাসে যন্তর মন্তর আবারও প্রমাণ করল, এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। নতুন কোনো জনঅসন্তোষ জন্ম নিলেই তার প্রতিধ্বনি সবচেয়ে আগে শোনা যায় এই প্রাঙ্গণেই। যে যন্তর মন্তর একসময় আকাশের নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করত, আজ সেই যন্তর মন্তরেই মাপা হয় ভারতের জনমতের তাপমাত্রা।##