কাজী আবুল মনসুর#
শীতের এক রাত। মস্কোর রাস্তায় তুষার জমে আছে থরে থরে, রেড স্কয়ারের পাথুরে চত্বর ঢেকে গেছে সাদা চাদরে। একজন সাধারণ নাগরিক কোট গায়ে জড়িয়ে বাড়ি ফিরছেন, তাঁর পায়ের শব্দ ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ। তিনি জানেন না, গত তিন দিন ধরে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ লেখা হয়ে যাচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য নথিতে। তাঁর টেলিফোনের প্রতিটি শব্দ, তাঁর বন্ধুকে লেখা চিঠির প্রতিটি বাক্য, এমনকি গতকাল রাতের সেই নিচু স্বরে বলা রসিকতাটুকুও, কিছুই আর তাঁর একার সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের একটি চোখ, যার কোনো পাতা পড়ে না, তাঁকে দেখছে। এই চোখের নাম কেজিবি (KGB)।
স্নায়ুযুদ্ধের চার দশক জুড়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে রহস্যময় গোয়েন্দা সংস্থার তকমা জুটেছিল একেই। শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, বিদেশে গুপ্তচরবৃত্তি, পাল্টা গোয়েন্দাগিরি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত পাহারা, এমনকি ক্রেমলিনের অন্দরমহলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ-রেখা গিয়ে মিশত এক জায়গায়: লুবিয়াঙ্কা স্কোয়ারের সেই হলুদ রঙের বিশাল দালানে। পশ্চিমা বিশ্বে এই নামটি উচ্চারিত হতো অর্ধেক ফিসফিস, অর্ধেক আতঙ্কে।
কিন্তু এই ভয়ের সাম্রাজ্য একদিনে তৈরি হয়নি। এর জন্ম কোনো পরিকল্পিত প্রাসাদে নয়, জন্ম হয়েছিল রক্ত, বিশ্বাসঘাতকতা আর টিকে থাকার মরিয়া লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে। গল্পটা শুরু করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯১৭ সালের রাশিয়ায়, যেখানে একটি সাম্রাজ্য ধসে পড়ছিল, আর তার ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন, নির্মম রাষ্ট্রযন্ত্র।
যে রাষ্ট্র জন্মের প্রথম দিন থেকেই বাঁচার জন্য লড়ছিল
১৯১৭ সাল। রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে টালমাটাল বছর। ফেব্রুয়ারির বিপ্লব তিনশো বছরের রোমানভ রাজবংশকে একরকম ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল, জার দ্বিতীয় নিকোলাস, যিনি নিজেকে ঈশ্বর-নিযুক্ত মনে করতেন, বাধ্য হলেন সিংহাসন ছেড়ে দিতে। কিন্তু সিংহাসন খালি হওয়া মানেই শান্তি ফিরে আসা নয়। নতুন অস্থায়ী সরকার এক অসম্ভব বোঝা কাঁধে তুলে নিল, একদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষরণ, অন্যদিকে দেশের ভেতরে খাদ্যের হাহাকার, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের ক্ষোভ, আর কৃষকদের জমির জন্য বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা। সরকার টলছিল, আর জনগণের ধৈর্য প্রতিদিন একটু একটু করে ফুরিয়ে আসছিল।
ঠিক এই ফাটল দিয়েই ঢুকে পড়ল ভ্লাদিমির লেনিন আর তাঁর বলশেভিক দল। অক্টোবরের এক রাতে, প্রায় নিঃশব্দে, ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো দখল করে নিল তারা। ইতিহাস একে মনে রেখেছে “অক্টোবর বিপ্লব” নামে। কিন্তু ক্ষমতা দখল করা আর ক্ষমতা ধরে রাখা, এই দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন যুদ্ধ। লেনিনের সরকার শিগগিরই বুঝল, তারা এক অসম্ভব ঘেরাটোপের মধ্যে বসে আছে।
চারদিক থেকে তেড়ে এল শত্রু। রাজতন্ত্রপন্থী অফিসাররা অস্ত্র তুলে নিলেন প্রতিশোধের নেশায়। উদারপন্থীরা জোট বাঁধল। এমনকি বলশেভিকদেরই একদা মিত্র সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীগুলো ফিরে গেল বিরুদ্ধ শিবিরে। দেশের প্রান্তে প্রান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিল। আর যেন এসবই যথেষ্ট ছিল না—ব্রিটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের মতো শক্তিধর দেশগুলোও সৈন্য আর অস্ত্র পাঠাতে শুরু করল বলশেভিক-বিরোধী “হোয়াইট আর্মি”-র পাশে দাঁড়িয়ে। ১৯১৮ সালের মধ্যে পুরো রাশিয়া জ্বলে উঠল রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের আগুনে—লাল বনাম সাদা, ভাই বনাম ভাই।
লেনিনের চোখে তখন পরিষ্কার একটাই সত্য: এই বিপ্লব বাঁচবে কি না, তা নির্ভর করছে এক মুহূর্তের অসতর্কতার ওপর। শত্রু শুধু সীমান্তের ওপারে নেই, শত্রু বসে আছে নিজেদের অফিসের ভেতরেই, রেলস্টেশনের কেরানির ছদ্মবেশে, এমনকি হয়তো পাশের ডেস্কেও। এই আতঙ্ক, এই সন্দেহ, এই টিকে থাকার মরিয়া তাগিদ থেকেই জন্ম নিল এক নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠানের ধারণা, এমন এক সংস্থা, যার চোখ থাকবে সর্বত্র, আর হাত পৌঁছাবে যে কোনো গোপন কোণে।
এক আপসহীন মানুষ, এক নির্মম প্রতিষ্ঠান
১৯১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর। ঠান্ডায় জমে যাওয়া পেত্রোগ্রাদের এক কক্ষে জন্ম নিল একটি প্রতিষ্ঠান, যার পূর্ণ নাম উচ্চারণ করতেই দম ফুরিয়ে যায়, “অল-রাশিয়ান এক্সট্রাঅর্ডিনারি কমিশন ফর কমব্যাটিং কাউন্টার-রেভলিউশন অ্যান্ড সাবোটাজ”। সংক্ষেপে ভেচেকা (VChK), যা ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকল আরও ছোট এক নামে ‘চেকা (Cheka)’।
আর এই ভয়ংকর যন্ত্রের প্রথম চালক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো এমন একজনকে, যাঁর নাম শুনলেই শত্রুর বুক কেঁপে উঠত, ফেলিক্স এডমুন্ডোভিচ জারজিনস্কি। পোলিশ বংশোদ্ভূত এই বিপ্লবী নিজে বছরের পর বছর জারের কারাগারে বন্দি ছিলেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, তবু আদর্শ থেকে এক চুলও সরেননি। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতেন “লৌহমানব”। কোনো আপস নেই, কোনো করুণা নেই, কোনো দ্বিধা নেই—শুধু বিপ্লবের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। এই নির্মম নিষ্ঠাই জারজিনস্কিকে এনে দিল লেনিনের পূর্ণ আস্থা, আর তাঁর হাত ধরেই চেকা মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পরিণত হলো সোভিয়েত রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে ক্ষমতাধর হাতিয়ারে।
লেনিন ও বলশেভিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করতেন, বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেও সক্রিয়। সরকারি দপ্তর, রেলপথ, শিল্পকারখানা, ডাক ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা—সব জায়গায় নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা ছিল। নতুন সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং বিপ্লবকে রক্ষা করা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর সোভিয়েত সরকার প্রতিষ্ঠা করে ভেচেকা (VChK)। এর পূর্ণাঙ্গ রুশ নাম ছিল Всероссийская чрезвычайная комиссия по борьбе с контрреволюцией и саботажем (Vserossiyskaya Chrezvychaynaya Komissiya po Borbe s Kontrrevolyutsiyey i Sabotazhem)। ইংরেজিতে এর নাম All-Russian Extraordinary Commission for Combating Counter-Revolution and Sabotage। সংস্থাটি ইতিহাসে সংক্ষেপে চেকা (Cheka) নামে বেশি পরিচিত।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চেকার নাম ও সাংগঠনিক রূপও পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘ এই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালের ১৩ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় কেজিবি (KGB)। এর পূর্ণাঙ্গ রুশ নাম Комитет государственной безопасности (Komitet Gosudarstvennoy Bezopasnosti)। ইংরেজিতে এর অর্থ Committee for State Security, আর বাংলায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কমিটি বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি।
চেকার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন ফেলিক্স এডমুন্ডোভিচ জারজিনস্কি (Felix Edmundovich Dzerzhinsky)। তাঁর নেতৃত্বেই সোভিয়েত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে, যার উত্তরসূরি হিসেবেই পরবর্তীকালে কেজিবি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থায় পরিণত হয়।
চার দশকের ছদ্মবেশ বদল: চেকা থেকে কেজিবি পর্যন্ত এক দীর্ঘ যাত্রা
অনেকেই ভাবেন, কেজিবির জন্ম বুঝি ১৯১৭ সালেই, পুরো নাম-পরিচয় নিয়ে। বাস্তবতা কিন্তু অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি নাটকীয়। ২০ ডিসেম্বর ১৯১৭-কে ইতিহাস “কেজিবির জন্মদিন” বলে মেনে নিলেও, সেদিন এই সংস্থার নাম ছিল শুধুই চেকা। এরপরের প্রায় চার দশক ধরে, প্রতিটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্থা বদলে ফেলেছে তার নাম, তার কাঠামো, এমনকি তার নিষ্ঠুরতার মাত্রাও—যেন এক অন্ধকার আত্মা বারবার নতুন খোলস পরে বেঁচে থেকেছে:
১৯১৭ — Cheka (VChK), জন্মের প্রথম রূপ
১৯২২ — GPU-তে রূপান্তর
১৯২৩ — OGPU নামে পুনর্গঠন
১৯৩৪ — NKVD-এর ছত্রছায়ায় GUGB হিসেবে অন্তর্ভুক্তি, স্তালিনের মহা-শুদ্ধি অভিযানের রক্তাক্ত সময়
১৯৪৬ — MGB (Ministry of State Security) নামে নতুন অধ্যায়
১৯৫৪ সালের ১৩ মার্চ — অবশেষে জন্ম নিল সেই নাম, যা ইতিহাসে চিরকালীন ভয়ের প্রতীক হয়ে থাকবে: KGB (Committee for State Security)।
অর্থাৎ কেজিবি কোনো একরাতে গজিয়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ছিল না। এ যেন এক দীর্ঘ রূপান্তরের গল্প—প্রতিটি নাম বদলের পেছনে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার লড়াই, শুদ্ধি অভিযান, রক্তপাত আর নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার নির্মম ইতিহাস।
তলোয়ার আর ঢাল: এক প্রতিষ্ঠানের দুই মুখ
কেজিবির কাজের পরিধি ছিল অকল্পনীয় রকম বিস্তৃত। বিদেশে গুপ্তচর পাঠানো তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, শত্রু গোয়েন্দাদের ফাঁদে ফেলা, হাজার হাজার কিলোমিটার সীমান্তে নজরদারি, ক্রেমলিনের শীর্ষ নেতাদের দেহরক্ষা বাহিনী পরিচালনা, সামরিক ও বৈজ্ঞানিক গোপন প্রযুক্তির তথ্য সংগ্রহ, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সোভিয়েত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সামান্যতম ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেই তা মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দেওয়া।
সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই গর্বের সঙ্গে কেজিবিকে অভিহিত করত এক অলংকৃত উপাধিতে,”পার্টির ঢাল ও তলোয়ার” (The Sword and Shield of the Party)। ঢাল, কারণ এটি রাষ্ট্রকে রক্ষা করত বাইরের আর ভেতরের প্রতিটি আঘাত থেকে। তলোয়ার, কারণ প্রয়োজন হলে এটি নির্মমভাবে আঘাত হানত শত্রুর বুকে—তা সে শত্রু বিদেশি গুপ্তচরই হোক, বা নিজের দেশেরই এক সন্দেহভাজন নাগরিক।
কিন্তু আটলান্টিকের ওপারে, পশ্চিমা বিশ্বের চোখে এই একই প্রতিষ্ঠানের ছবি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কাছে কেজিবি ছিল এক দুঃস্বপ্নের নাম—এমন এক অক্টোপাস, যার শুঁড় পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পৌঁছে যেত। কোনো দূতাবাসের নিরীহ কূটনীতিক, কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, এমনকি কোনো নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের অতিথি, যে কারো আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারত কেজিবির একজন এজেন্ট। এই অনিশ্চয়তা, এই সর্বব্যাপী সন্দেহই কেজিবিকে করে তুলেছিল শুধু একটি গোয়েন্দা সংস্থা নয়, বরং এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধাস্ত্র, যার আসল শক্তি ছিল এই বিশ্বাস তৈরিতে যে, তারা সর্বত্র আছে, সবকিছু জানে।
(আর এখান থেকেই শুরু হয় আসল গল্প—কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে, কীভাবে তৈরি হলো তার কুখ্যাত গুপ্তচর নেটওয়ার্ক, আর কীভাবে একের পর এক অভিযানে কাঁপিয়ে দিল ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন পর্যন্ত—পরের পর্বে পড়ুন)

