-- বিজ্ঞাপন ---

ফ্রান্সের নৌবাহিনীতে যুক্ত হলো চতুর্থ বারাকুডা পারমাণবিক অ্যাটাক সাবমেরিন

সিরাজুর রহমান#

ফ্রান্সের সমুদ্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও এক ধাপ শক্তিশালী হলো। দেশটির শীর্ষ জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Naval Group ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক শক্তিচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন De Grasse (S637) আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি প্রতিরক্ষা ক্রয় সংস্থা (DGA) এবং ফরাসি নৌবাহিনী (Marine Nationale)-এর কাছে হস্তান্তর করেছে।

চার মাসব্যাপী কঠোর সমুদ্র পরীক্ষা (Sea Trial) সফলভাবে সম্পন্ন করার পর সাবমেরিনটি হস্তান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে ফরাসি নৌবাহিনীর বহরে এখন মোট চারটি Barracuda (Suffren-class) পারমাণবিক শক্তিচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন যুক্ত হলো। এটি ফ্রান্সের পুরোনো Rubis শ্রেণির সাবমেরিনগুলোকে ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপনের বৃহৎ Barracuda Programme-এর গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়

প্রায় ৫,৩০০ টন (সাবমার্জড অবস্থায়) ওজনের এই সাবমেরিনটির দৈর্ঘ্য ৯৯.৫ মিটার এবং প্রস্থ (Beam) ৮.৮ মিটার। পানির নিচে এর সর্বোচ্চ গতি প্রায় ২৫ নট (প্রায় ৪৬ কিলোমিটার/ঘণ্টা)। এতে প্রায় ৬৫ জন নাবিক ও কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

সাবমেরিনটিতে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন K15 Pressurized Water Reactor (PWR) স্থাপন করা হয়েছে, যা থেকে উৎপন্ন শক্তির মাধ্যমে দুটি বৈদ্যুতিক মোটর সাবমেরিনটি পরিচালনা করে। পাশাপাশি জরুরি ব্যবহারের জন্য দুটি অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক মোটর এবং একটি অত্যন্ত নীরব Pump-jet Propulsor সংযোজন করা হয়েছে, যা শব্দ কমিয়ে গোপন অভিযানে কার্যকারিতা বাড়ায়।

একবার পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিস্থাপনের পর রিয়্যাক্টরটি প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। জ্বালানির দিক থেকে কার্যত এর অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা না থাকলেও খাদ্য ও অন্যান্য রসদের কারণে এটি সাধারণত টানা প্রায় ৭০ দিন সমুদ্রে অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম।

দীর্ঘমেয়াদি পানির নিচের অভিযানের জন্য এতে অক্সিজেন উৎপাদন ব্যবস্থা, কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ প্রযুক্তি এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সংযোজিত হয়েছে।

শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার

De Grasse-এ চারটি ৫৩৩ মিলিমিটার টর্পেডো টিউব রয়েছে, যেখান থেকে টর্পেডো, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা যায়। মোট ২৪টি অস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে, যার মধ্যে চারটি টিউবে প্রস্তুত অবস্থায় এবং বাকি ২০টি অভ্যন্তরীণ র্যাকে সংরক্ষিত থাকে।

এর প্রধান অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে—

F21 Heavyweight Torpedo
Exocet SM39 Block-2 Anti-Ship Missile
MdCN (SCALP Naval) Land Attack Cruise Missile
FG-29 Naval Mine

এছাড়া সাবমেরিনটি বিশেষ বাহিনীর (Special Forces) গোপন অভিযান পরিচালনার জন্যও উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে এটি SLBM (Submarine-Launched Ballistic Missile) বহনের জন্য নির্মিত নয়। অর্থাৎ এটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনকারী কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী সাবমেরিন নয়; বরং শত্রু সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ, স্থলভাগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

ফরাসি নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে বড় অগ্রগতি

বর্তমানে ফরাসি নৌবাহিনীর কাছে মোট নয়টি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন রয়েছে। এর মধ্যে চারটি Triomphant-class কৌশলগত ব্যালিস্টিক মিসাইলবাহী (SSBN), চারটি Barracuda/Suffren-class অ্যাটাক সাবমেরিন এবং একটি পুরোনো Rubis-class সাবমেরিন এখনও সীমিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেটিকেও আগামী ২০২৭ সালে অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ফরাসি সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ছয়টি Barracuda শ্রেণির সাবমেরিন নির্মাণ সম্পন্ন হবে। বর্তমানে শেষ দুটি সাবমেরিন Rubis এবং Casabianca নির্মাণাধীন রয়েছে। এগুলো বহরে যুক্ত হলে ফ্রান্সের পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা পরিচালনার সক্ষমতা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।##