-- বিজ্ঞাপন ---

নিষেধাজ্ঞার পাহাড় ডিঙিয়ে বিজ্ঞানের শিখরে ইরান

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উচ্চশিক্ষা ও মৌলিক গবেষণায় অবিশ্বাস্য সাফল্য দেখাচ্ছে ইরান। অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মাঝেও দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার মান ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম বর্তমান বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ন্যানোপ্রযুক্তি, রসায়ন, বেসামরিক পরমাণু, ডিফেন্স সিস্টেম এবং ফার্মাকোলজির মতো জটিল ও উচ্চস্তরের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে দেশটির অগ্রগতি এখন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।

কিউএস র‍্যাংকিং ২০২৭: গবেষণার মানে বিশ্বসেরাদের কাতারে
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৭’ (QS World University Rankings 2027)-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইরানের উচ্চস্তরের প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ কিছুটা সীমিত হলেও গবেষণার মানদণ্ডে তারা অনন্য উচ্চতায় রয়েছে। কিউএস মূলত গবেষণার মান পরিমাপের জন্য ‘প্রতি ফ্যাকাল্টিতে সাইটেশন’ (Citation per Faculty) সূচকটি ব্যবহার করে, যেখানে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কোর অত্যন্ত চমৎকার।

প্রকাশিত তালিকায় ইরানের মোট ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত হওয়ায়, সার্বিক স্কোরের বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।

দেশসেরা শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান
র‍্যাংকিংয়ের এক্সেল শিটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইরানের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে:

তেহরান ইউনিভার্সিটি: সামগ্রিক স্কোর ৪০.৮ নিয়ে গ্লোবাল র‍্যাংকিংয়ে ৩৬৭তম স্থানে রয়েছে। তবে এর সাইটেশন স্কোর ৮৯.৯, যা বিশ্বমানের গবেষণার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

শারিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি: সামগ্রিক স্কোর ৩৮.৮ নিয়ে ৩৯০তম স্থানে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের সাইটেশন স্কোর ৯৪.৯, যা প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে তাদের অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ।

আমিরকাবির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি: বৈশ্বিক তালিকায় ৪৮৪তম স্থানে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইটেশন স্কোর ৯৯.৯। এটি বিশ্বের শীর্ষ মাত্র ১% বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ গবেষণা সক্ষমতার পরিচয় দেয়।

ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: তালিকায় ৫০৫তম স্থানে থাকলেও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সাইটেশন সূচকে ১০০.০ স্কোর পেয়েছে, যা এই সূচকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ স্কোর।

ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি: সামগ্রিক স্কোর ২৭.৮ নিয়ে তালিকায় ৬২৪তম স্থানে রয়েছে এবং এর সাইটেশন স্কোর ৯৪.১।

এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব তাবরিজ (৬৮৯তম), শাহিদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটি (৭৮৭তম) এবং শিরাজ ইউনিভার্সিটি (৭৯৭তম) গ্লোবাল র‍্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

ন্যানোপ্রযুক্তিতে বিশ্বে চতুর্থ ইরান
একাধিক আন্তর্জাতিক জরিপ ও ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উচ্চস্তরের ন্যানোপ্রযুক্তি গবেষণায় চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পরেই বিশ্বে চতুর্থ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ইরান। বিশেষ করে, শারিফ ইউনিভার্সিটি এবং তেহরান ইউনিভার্সিটি থেকে প্রতি বছর ন্যানো-ম্যাটেরিয়ালস বিষয়ে শত শত উচ্চমানের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

র‍্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার মূল কারণ
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে ইরানের অবস্থান তুলনামূলক কম দেখানোর পেছনে মূল কারণ হলো বৈচিত্র্যের অভাব। কিউএস র‍্যাংকিংয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি এবং বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ওপর বড় একটি নম্বর থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা নামমাত্র। ফলে এই নির্দিষ্ট সূচকগুলোতে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় শূন্য নম্বর পেয়ে থাকে, যা তাদের সামগ্রিক র‍্যাংকিং কমিয়ে দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোচ্চ গবেষণাপত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাস্তব চিত্র বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইরানের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি ও মৌলিক গবেষণার মান বিশ্বের অন্যতম সেরা। দেশটির বিজ্ঞানীরা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোতে ৭০ হাজারেরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা মধ্যপ্রাচ্য ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নিষেধাজ্ঞার পাহাড় ডিঙিয়ে ইরান স্পেস টেকনোলজি (মহাকাশ প্রযুক্তি), স্টেম সেল থেরাপী এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো ফিউচারিস্টিক প্রযুক্তিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তেহরান ও শারিফ ইউনিভার্সিটি বর্তমানে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে এশিয়ার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ এবং তাদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে প্রবল আগ্রহ রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে যদি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কিছুটাও শিথিল হয়, তবে ইরান খুব দ্রুত বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ন্যানোপ্রযুক্তি থেকে জিনতত্ত্ব, মিসাইল সিস্টেম কিংবা বেসামরিক পরমাণু গবেষণা—সবক্ষেত্রেই ইরান প্রমাণ করেছে যে, মেধা ও ইতিবাচক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কোনো বৈশ্বিক বাধা বা অজুহাত মানে না।##