-- বিজ্ঞাপন ---

২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে ভয়েজার-১: কোথায় যাচ্ছে মানবজাতির এই মহাকাশযান? (শেষ পর্ব)

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

মহাবিশ্বের বিশালতা বোঝার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সাধারণত কিলোমিটারের পরিবর্তে আলোকবর্ষ (Light-year) এবং পারসেক (Parsec) একক ব্যবহার করেন। এক আলোকবর্ষ হলো এক বছরে শূন্যস্থানে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে, যার পরিমাণ প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার (অর্থাৎ প্রায় ৯,৪৬০ বিলিয়ন কিলোমিটার)। সেই হিসেবে ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করলেও এটি মাত্র প্রায় ০.০০২৬৪ আলোকবর্ষ, অর্থাৎ এক আলোকবর্ষের প্রায় ০.২৬৪ শতাংশ পথ অতিক্রম করেছে। মানবজাতির দৃষ্টিতে এটি এক অবিশ্বাস্য অর্জন হলেও মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় এই দূরত্ব এখনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র।

আবার মহাজাগতিক দূরত্ব পরিমাপের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ একক হলো পারসেক (Parsec)। এক পারসেক সমান প্রায় ৩.২৬ আলোকবর্ষ। গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ও নীহারিকার মধ্যকার দূরত্ব নির্ণয়ে এই একক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই পরিমাপগুলোর সঙ্গে ভয়েজার-১-এর বর্তমান অবস্থানের তুলনা করলে সহজেই উপলব্ধি করা যায়, মহাবিশ্ব কতটা অসীম বিস্তৃত এবং সেই তুলনায় মানব প্রযুক্তির বর্তমান সক্ষমতা এখনো কত সীমিত।

বর্তমান গতিতে, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার বেগে চলতে থাকলে ভয়েজার-১-এর মাত্র এক আলোকবর্ষ পথ অতিক্রম করতেই আনুমানিক ১৮ হাজার ৫০০ বছরেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। সে সময় পর্যন্ত আধুনিক মানবসভ্যতা বর্তমান রূপে টিকে থাকবে কি না, কিংবা পৃথিবীতে আদৌ মানুষের অস্তিত্ব থাকবে কি না—তা নিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব। তবুও ভয়েজার-১ তার নির্ধারিত গতিপথে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলবে।

বর্তমানে এটি কোনো নির্দিষ্ট নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে না। তবে নাসার বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও কক্ষপথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর পরে ভয়েজার-১ Camelopardalis (জিরাফ নক্ষত্রমণ্ডল)-এ অবস্থিত Gliese 445 (AC+79 3888) নামের একটি লাল বামন (Red Dwarf) নক্ষত্রের কাছাকাছি পৌঁছাবে। অবশ্য সেটিও নক্ষত্রটির সঙ্গে সাক্ষাৎ নয়; মহাকাশযানটি প্রায় ১.৬ আলোকবর্ষ দূর দিয়ে অতিক্রম করবে। মহাজাগতিক পরিমাপে এটিকে তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ধরা হলেও মানুষের দৃষ্টিতে এটি এখনো এক অকল্পনীয় দূরত্ব।

অন্যদিকে, আমাদের সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র হলো প্রক্সিমা সেন্টুরি (Proxima Centauri)। এটিও একটি লাল বামন নক্ষত্র এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.২৪৬ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। যদিও ভয়েজার-১-এর গতিপথ প্রক্সিমা সেন্টুরির দিকে নয়, তবুও তুলনামূলকভাবে বলা যায়, যদি এটি একই গতিতে সরাসরি সেই নক্ষত্রের দিকে অগ্রসর হতো, তাহলে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ৮০ হাজার বছরেরও বেশি সময় লেগে যেত। এই তুলনাটি আমাদের উপলব্ধি করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বে নক্ষত্রগুলোর মধ্যকার দূরত্ব কতটা বিস্ময়কর এবং বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণ এখনো কত বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

ভয়েজার-১ শুধু একটি মহাকাশযান নয়; এটি মানবসভ্যতার জ্ঞানপিপাসা, অনুসন্ধিৎসা এবং অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছার প্রতীক। এর ভেতরে সংরক্ষিত Golden Record-এ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার শুভেচ্ছাবার্তা, প্রাকৃতিক শব্দ, সঙ্গীত এবং মানবসভ্যতার পরিচয় বহনকারী নানা তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। যেন ভবিষ্যতের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী একদিন যদি এই মহাকাশযানটির সন্ধান পায়, তবে তারা জানতে পারবে—অসীম মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র নীল গ্রহে একসময় কৌতূহলী এক সভ্যতার বসবাস ছিল।

সম্ভবত আগামী ২০৩০-এর দশকের শুরুতে বিদ্যুৎশক্তির ঘাটতির কারণে ভয়েজার-১-এর সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু তাতেও এর যাত্রা থেমে যাবে না। কোটি কোটি বছরের জন্য এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অন্ধকার বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে নীরবে ছুটে চলবে, সঙ্গে বহন করবে পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের অস্তিত্বের চিহ্ন এবং এক সভ্যতার অমর স্বপ্ন।

হয়তো কোনো দিন এই মহাকাশযান আর পৃথিবীর কোনো সংকেতের জবাব দেবে না। তবুও ভয়েজার-১ মানবজাতিকে চিরকাল স্মরণ করিয়ে দেবে—মহাবিশ্ব যতই বিশাল, রহস্যময় এবং দুর্জেয় হোক না কেন, মানুষের কৌতূহল, জ্ঞান অনুসন্ধান এবং নতুন দিগন্ত জয় করার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই সভ্যতাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেই অর্থে ভয়েজার-১ শুধু মহাকাশে ছুটে চলা একটি যন্ত্র নয়, বরং মানবজাতির অনন্ত স্বপ্নের এক নীরব দূত।##