কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু প্রযুক্তিগত অর্জন রয়েছে, যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে মানবজাতির কৌতূহল, সাহস এবং জ্ঞান অনুসন্ধানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভয়েজার-১ (Voyager 1) সেই অসাধারণ অর্জনগুলোর অন্যতম। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে উৎক্ষেপণ করা এই ছোট্ট মহাকাশযানটি আজ পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। পৃথিবীর কোনো মানুষ এত দূরে কখনো পৌঁছাতে পারেনি, এমনকি মানবজাতির তৈরি অন্য কোনো কৃত্রিম বস্তু আজ পর্যন্ত এত দূর মহাকাশে যেতে সক্ষম হয়নি। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ সময়ের ক্ষয় এবং মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশকে অতিক্রম করে ভয়েজার-১ এখনো মানবসভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে অজানা আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে ছুটে চলেছে। এটি যেন আমাদের অস্তিত্ব, কৌতূহল এবং জ্ঞান অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষার এক নীরব দূত।
মহাকাশে পাঠানো এখনো পর্যন্ত মানবজাতির সবচেয়ে দূরবর্তী কৃত্রিম বস্তু (Human-made Object) হলো ভয়েজার-১ স্পেস-প্রোব বা মহাকাশযান। ১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এটি উৎক্ষেপণ করে। বর্তমানে এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬১,০০০ কিলোমিটার (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার) বেগে মহাকাশে ছুটে চলেছে।
বর্তমানে ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। এত বিশাল দূরত্ব থেকে পাঠানো একটি রেডিও সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছাতে এখন ২২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে পাঠানো একটি নির্দেশ মহাকাশযানটিতে পৌঁছাতে যেমন প্রায় ২২ ঘণ্টা সময় লাগে, তেমনি সেখান থেকে পাঠানো প্রতিক্রিয়া পৃথিবীতে ফিরে আসতেও আরও প্রায় ২২ ঘণ্টা লাগে। ফলে একটি সাধারণ নির্দেশ পাঠিয়ে তার উত্তর পেতে প্রায় দুই দিন সময় লেগে যায়। তবুও সফটওয়্যার আপডেট এবং বিশেষ প্রকৌশল কৌশলের মাধ্যমে নাসার বিজ্ঞানীরা ভয়েজার-১-এর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আসলে, এটি সত্তরের দশকের প্রযুক্তিতে নির্মিত একটি মহাকাশযান। বর্তমান যুগের আধুনিক কম্পিউটার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির সঙ্গে এর কোনো তুলনাই চলে না। তবুও মহাকাশের অসীম দূরত্বে মানবজাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের প্রতীক বহন করে চলা এক অমূল্য বৈজ্ঞানিক সম্পদ হিসেবে ভয়েজার-১-এর গুরুত্ব আজও অপরিসীম। উল্লেখ্য, ভয়েজার-১ উৎক্ষেপণের মাত্র ১৬ দিন আগে, ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট নাসা ভয়েজার-২ স্পেস-প্রোবও মহাকাশে পাঠায়। যদিও ভয়েজার-২ আগে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, দ্রুতগতির কারণে ভয়েজার-১-ই পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
৭২১.৯ কেজি ওজনের ভয়েজার-১ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে একটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (Radioisotope Thermoelectric Generator-RTG) থেকে। এতে থাকা প্লুটোনিয়াম-২৩৮-এর তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লুটোনিয়ামের ক্ষয় এবং যন্ত্রাংশের স্বাভাবিক অবনতির কারণে এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বর্তমানে এটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ ওয়াট শক্তি হারাচ্ছে।
এই কারণে নাসার প্রকৌশলীরা ধাপে ধাপে মহাকাশযানটির কিছু হিটার এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা সেন্সর বন্ধ করে শক্তি সাশ্রয়ের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে, যাতে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে জ্বালানি লাইনের পাইপ জমে না যায়। কারণ একবার যদি জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত হয়, তাহলে ভয়েজার-১-এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতা এবং প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিযাত্রা সত্ত্বেও ভয়েজার-১ আজও মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার অন্যতম বিস্ময় হিসেবে টিকে রয়েছে।
বর্তমানে এটি আমাদের সৌরজগতের সীমানা অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশ (Interstellar Space) থেকে প্রতিনিয়ত মূল্যবান বৈজ্ঞানিক তথ্য পৃথিবীতে পাঠিয়ে চলেছে। এই তথ্যগুলো বিজ্ঞানীদের সৌরজগতের বাইরের মহাজাগতিক পরিবেশ, মহাজাগতিক রশ্মি (Cosmic Rays), চৌম্বক ক্ষেত্র এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক প্লাজমা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বিদ্যুৎশক্তি ক্রমাগত কমে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০-এর দশকের শুরুতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভয়েজার-১-এর সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, উৎক্ষেপণের প্রায় ৪৯ বছর পর ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছে। মানবজাতির দৃষ্টিতে এটি এক অবিশ্বাস্য দূরত্ব হলেও মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র।

