-- বিজ্ঞাপন ---

রাত জেগে স্ক্রিনে চোখ, ঘুমহীনতার ফাঁদে এক প্রজন্ম: নীরব মহামারি ‘ইনসমনিয়া’

কাজী আবুল মনসুর#

রাত বারোটা, একটা কিংবা দুইটা…এখন আর এগুলো শুধুই গভীর রাতের সময় নয়; অনেক পরিবারের কাছে এ যেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। বাবা-মা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, কেউ অফিসের কাজ শেষ করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করছেন। আর সেই পরিবেশেই বড় হচ্ছে শিশুরা। তারাও দেরি করে ঘুমায়, সকালে ঘুম ভাঙে না, অথচ ঠিকই স্কুলে যেতে হয়।

শুধু শিশুরাই নয়, কিশোর-তরুণদের বড় একটি অংশ রাতভর গেম খেলছে, ভিডিও দেখছে কিংবা ইন্টারনেটে সময় কাটাচ্ছে। ভোর হতে না হতেই শুরু হয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা কোচিংয়ের দৌড়। ফলাফল—অপর্যাপ্ত ঘুম, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব, খিটখিটে মেজাজ এবং ধীরে ধীরে এক নীরব রোগের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সেই রোগের নাম ইনসমনিয়া বা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যা।

ইনসমনিয়া আসলে কী?

অনেকেই মনে করেন, এক-দু’দিন ঘুম না হলে সেটাই ইনসমনিয়া। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ঘুমাতে অসুবিধা হওয়া, ঘুম ধরে রাখতে না পারা কিংবা খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং এর ফলে দিনের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হওয়াকে ইনসমনিয়া বলা হয়।

এটি শুধু বয়স্কদের নয়; শিশু, কিশোর, তরুণ সব বয়সের মানুষেরই হতে পারে।

ইনসমনিয়ার ধরন

বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ইনসমনিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করেন—

১. ট্রানজিয়েন্ট ইনসমনিয়া: কয়েক দিন স্থায়ী হয়। সাধারণত ভ্রমণ, মানসিক চাপ বা পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে দেখা দেয়।

২. অ্যাকিউট ইনসমনিয়া: কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পরীক্ষার চাপ, চাকরির দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা বা বড় কোনো মানসিক আঘাত এর কারণ হতে পারে।

৩. ক্রনিক ইনসমনিয়া: সপ্তাহে অন্তত তিন দিন করে তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকলে তাকে ক্রনিক ইনসমনিয়া বলা হয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

কেন বাড়ছে এই সমস্যা?

আজকের জীবনযাত্রায় ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে স্ক্রিন। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের নীল আলো (Blue Light) শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।

এছাড়া আরও যেসব কারণে ইনসমনিয়া দেখা দিতে পারে—

অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ
ধূমপান
অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি
হরমোনজনিত পরিবর্তন
দীর্ঘদিনের ব্যথা
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
শব্দ ও আলোকদূষণ
কম ঘুম মানেই কি ইনসমনিয়া?

একেবারেই নয়।

অনেক সময় ঘুমের সমস্যা অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।

যেমন—

স্লিপ অ্যাপনিয়া
রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম
ডিপ্রেশন
উদ্বেগজনিত সমস্যা
জেট ল্যাগ
শিফট ডিউটির কারণে শরীরের জৈবঘড়ির পরিবর্তন

তাই কয়েক দিন ঘুম কম হলেই নিজেকে ইনসমনিয়ার রোগী ভাবার কারণ নেই। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

নারীদের ক্ষেত্রে কেন বেশি দেখা যায়?

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে ইনসমনিয়া তুলনামূলক বেশি।

এর পেছনে রয়েছে—

মাসিকের সময় হরমোনের ওঠানামা
গর্ভাবস্থা
সন্তান জন্মের পর ঘুমের ব্যাঘাত
মেনোপজ

গর্ভাবস্থায় অনেক নারীই ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি শারীরিক অস্বস্তি, পিঠব্যথা, শিশুর নড়াচড়া এবং প্রসব নিয়ে দুশ্চিন্তা এর অন্যতম কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান জন্মের পর এ সমস্যা কমে যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ঘুমের অভাবে কী হতে পারে?

দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর ফলে দেখা দিতে পারে—

সারাদিন ক্লান্তি
মনোযোগ কমে যাওয়া
স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া
খিটখিটে মেজাজ
মাথাব্যথা
চোখে জ্বালাপোড়া
ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া
উচ্চ রক্তচাপ
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
হৃদরোগের ঝুঁকি
উদ্বেগ ও বিষণ্নতা
জীবনযাত্রার ছোট পরিবর্তনেই মিলতে পারে স্বস্তি

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।

যা করতে পারেন—

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন।
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহার বন্ধ করুন।
বিকেলের পর অতিরিক্ত চা, কফি বা কোল্ড ড্রিংক এড়িয়ে চলুন।
রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবার খাবেন না।
শোবার ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখুন।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে নয়।
প্রতিদিন কিছু সময় মেডিটেশন বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করুন।
২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না এলে বিছানায় এপাশ-ওপাশ না করে উঠে হালকা বই পড়ুন বা শান্ত কোনো সুর শুনুন।
ঘুমের ওষুধ কি সমাধান?

অনেকেই সামান্য ঘুমের সমস্যায় নিজে থেকেই ঘুমের ওষুধ খাওয়া শুরু করেন। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ঘুমের ওষুধ সাময়িকভাবে ঘুম আনলেও দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে এবং প্রকৃত সমস্যাটি আড়াল হয়ে যায়।

তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ঘুমের ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

শেষ কথা

ভালো ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি।

কাজের ব্যস্ততা, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা জীবনের নানা চাপ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন এনে আমরা ঘুমকে আবারও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে পারি।

মনে রাখবেন, প্রতিদিনের ভালো ঘুম মানেই শুধু পরদিন সতেজ থাকা নয়; বরং সুস্থ হৃদ্‌যন্ত্র, ভালো মানসিক স্বাস্থ্য, শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।

তাই রাতকে স্ক্রিনের জন্য নয়, ঘুমের জন্যই রেখে দিন। হয়তো একদিন আপনি আর ভাববেন না—”আজও ঘুম আসবে তো?” বরং বিরক্ত হবেন এই ভেবে—”এত তাড়াতাড়ি সকাল হয়ে গেল!”##(বিদেশী পত্রিকা অবলম্বনে)