সিরাজুর রহমান#
আমাদের দেশের একজন পরিশ্রমী গবেষক ও উদ্ভাবক ড. মাহমুদ হাসান ২০২৫ সালে নিজ উদ্যোগে বাংলা ক্যালকুলেটর ‘ধারাপাত’ তৈরি করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল কম খরচে, সহজ প্রযুক্তিতে এবং দেশীয়ভাবে একটি কার্যকর বাংলা সংখ্যা-ভিত্তিক ক্যালকুলেটর তৈরি করা।
একইভাবে সম্প্রতি তা’মীরুল মিল্লাত মাদ্রাসা-র সায়েন্স ক্লাবের তিনজন অদম্য শিক্ষার্থী “Hydroplasma X” নামের প্লাজমা-ভিত্তিক পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তির একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়ে দূষিত পানিকে শতভাগ বিশুদ্ধ করা সম্ভব।
তবে বাস্তবতা হলো, কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর যদি সেটি শিল্প খাতের সহযোগিতায় সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগীভাবে উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সেই উদ্ভাবনের বাস্তব উদ্দেশ্য অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়।
বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতি বছর বহু নতুন নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনী ধারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এলেও পরবর্তীতে সেগুলোর বড় একটি অংশ আর বাস্তব প্রয়োগ বা বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ হেলিকপ্টার, রকেট, রোবোটিক বাহু কিংবা বিকল্প জ্বালানিচালিত যান তৈরির চেষ্টা করছেন। এসব অভাবনীয় উদ্ভাবন ও উদ্যোগ প্রযুক্তির প্রতি মানুষের প্রবল আগ্রহ ও উদ্ভাবনী চিন্তার পরিচয় দেয়।
তবে আমাদের দেশে বাস্তবে দেখা যায়, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণা সহায়তা না থাকায় এবং বিশেষ করে শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের অভাবে অধিকাংশ উদ্ভাবনই পরীক্ষামূলক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকে যায় কিংবা সেগুলো আর সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা সম্ভব হয় না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এখনো বিদেশি যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা অন্যান্য দেশের তৈরি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ব্যবহার করেই অনেক প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়।
এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন বাস্তবতার অংশ হলেও, সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ও দেশীয় মৌলিক প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। অন্যদিকে শিল্প সেক্টরের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাজারে আসতে পারে না।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, শুধু বাংলাদেশ-এই নয়— উন্নত দেশগুলোতেও হাজার হাজার গবেষণা ও উদ্ভাবিত প্রোটোটাইপ কখনো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন কিংবা বাজারে আসে না। কিন্তু সেখানে গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে।
ফলে অতি সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগুলো সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় দ্রুত উন্নয়ন, উৎপাদন ও বাজারজাত করার সুযোগ পায়। অন্যদিকে আমাদের দেশে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
তবে শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে হলেও দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নতুন আশার আলো খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন: দেশের এক মেধাবী তরুণের উদ্ভাবিত অভ্র বাংলা ভার্চুয়াল কি-বোর্ড সফটওয়ার এখন সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাই দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ইনোভেশন হাবে রূপান্তর করতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকেও আন্তর্জাতিক মানের এবং বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য নিজস্ব প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তৈরি করা সম্ভব হবে।##

