-- বিজ্ঞাপন ---

ইরান-তুরস্কের উত্থান, গবেষণায় নতুন আশা দেখছে মুসলিম বিশ্ব

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে (R&D) বিনিয়োগ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মহাকাশ বিজ্ঞান, ন্যানো টেকনোলজি, রোবটিক্স ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো খাতে যারা এগিয়ে যাচ্ছে, তারাই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক নেতৃত্ব নির্ধারণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজস্ব গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ কোনো জাতির পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বৈশ্বিক গবেষণা বিনিয়োগে কারা এগিয়ে?

বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো এখনও শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে প্রতি বছর আনুমানিক ৮০০ থেকে ৮৫০ বিলিয়ন ডলার গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যয় করছে। প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মহাকাশ গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দেশটির নেতৃত্ব এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত গবেষণা বিনিয়োগের পরিমাণ বছরে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি চীনও গবেষণা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটি প্রতি বছর প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বৈশ্বিকভাবে শীর্ষস্থানীয় গবেষণা শক্তিগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতও প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ মিলিয়ে ভারতের মোট বরাদ্দ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুসলিম বিশ্বের বাস্তবতা

বিশ্বের প্রায় ৬১টি মুসলিম দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বড় হলেও গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে তাদের বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত R&D বিনিয়োগ প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৩০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা এককভাবে চীনের বিনিয়োগের সমপর্যায়ের।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘদিনের অবহেলা মুসলিম দেশগুলোর প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

কেন পিছিয়ে মুসলিম বিশ্ব?

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি প্রধান কারণে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

এর মধ্যে রয়েছে—

জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণায় তুলনামূলক কম বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, আধুনিক গবেষণাগার ও অবকাঠামোর ঘাটতি, প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং “ব্রেন ড্রেন” বা মেধা পাচারের প্রবণতা, যেখানে দক্ষ গবেষক ও বিজ্ঞানীরা উন্নত সুযোগ-সুবিধার জন্য বিদেশে চলে যান।
আশার আলো দেখাচ্ছে কয়েকটি দেশ

তবে সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মুসলিম বিশ্বের কিছু দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

ইরানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি

দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছে। ন্যানো টেকনোলজি গবেষণাতেও দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে এবং এ খাতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

তুরস্কের ড্রোন বিপ্লব

সামরিক প্রযুক্তি ও ড্রোন শিল্পে তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বে আলোচিত একটি নাম। দেশটির তৈরি বায়রাকতার সিরিজের ড্রোন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। একই সঙ্গে অটোনোমাস ও মানববিহীন বিমান প্রযুক্তিতেও তুরস্ক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

সৌদি আরব ও ইউএইয়ের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির আওতায় সৌদি আরব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সুপারকম্পিউটিং, রোবোটিক্স ও স্মার্ট সিটি উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। হজ ব্যবস্থাপনায়ও আধুনিক প্রযুক্তি ও AI-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) এবং মালয়েশিয়াও গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ বিজ্ঞান, ন্যানো টেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং রোবটিক্স হবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মূল ক্ষেত্র।

তাদের মতে, শিক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া কোনো দেশই প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হতে পারবে না। মুসলিম বিশ্ব যদি আবার জ্ঞান, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থানে ফিরতে চায়, তবে এখনই শিক্ষা ও গবেষণাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের শীর্ষে স্থান দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ করে, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত তারাই গ্রহণ করে।”##