নাহিদ সরকার, নিউইর্য়ক#
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাজিত করে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং পররাষ্ট্রনীতির ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই পরাজয়ের অর্থ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ হারানো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের মেয়াদ এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী মেয়াদ আলাদা। ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েও ট্রাম্প ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
নির্বাচনের ফলাফল এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি, ইরান যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্ক তীব্র। এসব ইস্যুতে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী কিছু রাজ্যেও ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য জয় পেয়েছেন। ভোটারদের একটি বড় অংশ জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফলে এই নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ওপর ভোটারদের মূল্যায়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
আমেরিকার নির্বাচন আসলে কী?
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। দেশটির প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেসের সদস্য, অঙ্গরাজ্যের গভর্নর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন মেয়াদে নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আইনসভা কংগ্রেস। এর দুটি কক্ষ, প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেট। আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চার বছর মেয়াদে। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর এবং সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। এ কারণে প্রতি দুই বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনকে বলা হয় ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই মধ্যবর্তী নির্বাচন।
এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন নির্বাচনের আওতায় আসে। ফলে ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না করলেও তাঁদের ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা সরাসরি নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। সিনেটররাও অঙ্গরাজ্যভিত্তিক সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। এই দুই কক্ষের ক্ষমতা ও দায়িত্ব আলাদা হলেও জাতীয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কত বছর পরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রার্থী পরবর্তী বছরের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সরাসরি জাতীয় ভোটের মোট সংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচিত হন না। দেশটিতে রয়েছে ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবস্থা। ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসির জন্য নির্ধারিত ইলেক্টোরাল ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। মোট ৫৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোটের মধ্যে ২৭০টি পেলে কোনো প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই ব্যবস্থার কারণে কোনো প্রার্থী জাতীয় পর্যায়ে বেশি জনপ্রিয় ভোট পেয়েও ইলেক্টোরাল ভোটে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
এই নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, ইলেক্টোরাল কলেজের কারণে কিছু অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলনামূলক বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, এটি অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও ফেডারেল কাঠামো রক্ষা করে।
আমেরিকায় রাজনৈতিক দল কয়টি?
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর কোনো সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা নেই। সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। তবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রধানত দুটি দলের আধিপত্য। একটি রিপাবলিকান পার্টি, অন্যটি ডেমোক্রেটিক পার্টি। রিপাবলিকান পার্টি সাধারণত রক্ষণশীল রাজনীতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, কর হ্রাস, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির পক্ষে অবস্থান নেয়। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন এই দলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টি সাধারণত সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নাগরিক অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সরকারের সামাজিক দায়িত্ব বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নেয়। এ ছাড়া গ্রিন পার্টি, লিবার্টারিয়ান পার্টিসহ বিভিন্ন ছোট রাজনৈতিক দল রয়েছে। অনেক ভোটার নিজেদের কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মনে করেন না। তাঁরা স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে পরিচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রধান দুই দলের প্রার্থীই সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভোট ও রাজনৈতিক সমর্থন পান। এ কারণে দেশটির রাজনীতিকে প্রায়ই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বলা হয়।
একজন প্রেসিডেন্ট কতবার নির্বাচিত হতে পারেন?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন। অর্থাৎ কেউ একটানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আবার প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিরতি দিয়ে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হলেও তাঁর মোট নির্বাচিত মেয়াদ দুইয়ের বেশি হতে পারে না। তবে কোনো ব্যক্তি অন্য প্রেসিডেন্টের মেয়াদের অবশিষ্ট অংশে দায়িত্ব পালন করে থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে। কেউ যদি অন্য প্রেসিডেন্টের মেয়াদের দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তিনি কেবল একবার নির্বাচিত হতে পারবেন। আর দুই বছর বা তার কম সময় দায়িত্ব পালন করলে তিনি দুইবার নির্বাচিত হতে পারেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে বর্তমান সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, তিনি আর নির্বাচিত হয়ে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। এই নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ সীমিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা।
ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন: কীভাবে বদলে গেল রাজনীতি?
২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জো বাইডেনের প্রশাসনের পর অর্থনীতি, অভিবাসন, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে ট্রাম্প আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ছিল প্রধান। তাঁর বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, শুল্কনীতি, সরকারি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামরিক নীতিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর প্রশাসনের নীতিগুলো নিয়ে বিতর্কও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শুল্কনীতির প্রভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পেছনে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
কেন ভরাডুবি হলো রিপাবলিকানদের?
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটারদের কাছে অর্থনীতি একটি প্রধান নির্বাচনী ইস্যু। খাদ্য, জ্বালানি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
‘পিও রিসার্চ সেন্টার’-এর ৮ অক্টোবরের জরিপে দেখা যায়, ৮৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার অর্থনীতিকে তাঁদের ভোটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই জরিপে ৭৩ শতাংশ ভোটার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে দেখেছেন। জরিপে ট্রাম্পের কর্মসম্পাদনে অনুমোদনের হার ছিল ৩০ শতাংশ। বিপরীতে ৬৮ শতাংশ তাঁর কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম, সামরিক ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মার্কিন ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভোটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বা বড় প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের প্রতি অসন্তোষও নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় পতন
পিও রিসার্চ সেন্টার’-এর জরিপ অনুযায়ী, ৪৪ শতাংশ ভোটার তাঁদের কংগ্রেস নির্বাচনের ভোটকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট হিসেবে দেখেছেন। মাত্র ১৯ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তাঁরা তাঁর সমর্থনে ভোট দিচ্ছেন। জরিপে আরও দেখা যায়, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া কিছু ভোটারের মধ্যেও তাঁর কর্মসম্পাদন নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে এই পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।
ডেমোক্র্যাটদের বাড়তি নির্বাচনী উদ্দীপনা
নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ বেশি ছিল। ‘পিইডব্লিউ’-এর জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ও আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এই বাড়তি নির্বাচনী উদ্দীপনা এবং রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ একসঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক: নির্বাচনের পর কী হবে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্ক দেশটির পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত স্বার্থ, সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ। ট্রাম্প প্রশাসনও ইসরাইলের প্রতি শক্তিশালী সমর্থনের অবস্থান নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা নিয়ে তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা, যুদ্ধের ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে আরও আলোচনা ও নজরদারি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক হঠাৎ ভেঙে পড়বে। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি দীর্ঘদিনের এবং কংগ্রেসের দুই দলের মধ্যেই ইসরাইলের প্রতি সমর্থন রয়েছে। নতুন কংগ্রেসের ভূমিকা হতে পারে সহায়তার শর্ত, মানবিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের কৌশল নিয়ে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করা।
যুদ্ধের গতিপথ: ইরান সংঘাত কি থামবে?
২০২৬ সালের নির্বাচনে ইরান যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা মার্কিন ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা চালায়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি হলেও সংঘাত পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি এবং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ২৩ অক্টোবরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার চেষ্টা সত্ত্বেও দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি এবং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি প্রয়োজন। তবে নির্বাচনের ফলাফল সরাসরি যুদ্ধ বন্ধ করে দেবে,এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে যুদ্ধ পরিচালনা ও সামরিক সিদ্ধান্তে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস যুদ্ধের অর্থায়ন, সামরিক ব্যয়, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের জবাবদিহির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস যুদ্ধের অর্থায়ন ও প্রশাসনের সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ।
অবস্থা দৃষ্টিতে দেখা যায়, নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে দুটি রাজনৈতিক পথ তৈরি হয়েছে। একদিকে যুদ্ধের ব্যয় ও জনমত বিবেচনায় কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা। অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, ইরানের অবস্থান, ইসরাইলের কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের ওপর।
আমেরিকার সাধারণ মানুষ কী ভাবছে?
নির্বাচনের ফলাফলকে শুধু দলীয় জয়-পরাজয় হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ভোটারদের উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক প্রত্যাশার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। পিইডব্লিউ’-এর জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৭৭ শতাংশ মানুষ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। ৭৩ শতাংশ ভোটার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে দেখেছেন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অভিবাসন এবং পররাষ্ট্রনীতিও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব ভোটার একইভাবে ভাবছেন না। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ ট্রাম্পের অভিবাসননীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিকে সমর্থন করেন, আবার কেউ তাঁর প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নীতির সমালোচনা করেন।
নির্বাচনের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, একটি বড় অংশের ভোটার বর্তমান প্রশাসনের নীতির ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের একক রাজনৈতিক মতামত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভোটারদের অসন্তোষ শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধের ব্যয়, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ,সবকিছু মিলিয়ে ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গড়ে উঠেছে।
নির্বাচনের পর আমেরিকার ভবিষ্যৎ কোন পথে?
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়ন ও বাজেট অনুমোদনের পথ কঠিন হবে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত করতে পারবেন এবং কংগ্রেসের কমিটিগুলোর মাধ্যমে জবাবদিহি বাড়াতে পারবেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। তিনি প্রশাসনিক নির্দেশনা দিতে পারবেন, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কংগ্রেসে পাস হওয়া আইনে ভেটো দিতে পারবেন।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সমঝোতা, সংঘাত এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এই ফলাফল প্রভাব ফেলতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা নতুন নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক পুনরুত্থানের দাবি তুলতে পারবেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক বাড়তে পারে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করা যায় না। আগামী দুই বছরে অর্থনীতি, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ট্রাম্পের ক্ষমতা কিন্ত এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে। আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠবে এই নির্বাচনের ফলাফল।#

