কাজী আবুল মনসুর#
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ঘনিয়ে আসছে সামরিক সংঘাতের কালো মেঘ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন করে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর বিকল্প বিবেচনা করছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভাব্য এই হামলা ঘিরে একদিকে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি, সব মিলিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি।
ভয়েস অব আমেরিকা (VOA), অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আঞ্চলিক মিত্ররা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকলেও প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে।এ পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত অ-পারমাণবিক বোমাগুলোর একটি—GBU-43/B MOAB, যার পরিচিত নাম ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’।
নির্বাচনের পর ইরানে হামলার পরিকল্পনা?
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সামরিক অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এপি এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশকে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলা এবং ইরানের পাল্টা আঘাতের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট সময়, লক্ষ্যবস্তু কিংবা সামরিক অভিযানের পরিধি এখনো নিশ্চিত নয়।২৯ অক্টোবর ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক বক্তব্যে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘সব বিকল্প খোলা’ রেখেছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। ৩১ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানি প্রতিনিধিরা কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। অর্থাৎ একদিকে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ, দুই প্রক্রিয়াই পাশাপাশি চলছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের জন্যই হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
MOAB: যুক্তরাষ্ট্রের ‘সব বোমার মা’
GBU-43/B MOAB-এর পূর্ণ নাম Massive Ordnance Air Blast। এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি বিশাল আকারের প্রচলিত অ-পারমাণবিক বোমা। এর ডাকনাম ‘Mother of All Bombs’ বা ‘সব বোমার মা’। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী একটি বৃহৎ আকারের নির্ভুল-নির্দেশিত বোমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা Air Force Research Laboratory (AFRL)-এর উদ্যোগে অস্ত্রটির উন্নয়ন করা হয়। এর নকশা ও নির্মাণপ্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Dynetics যুক্ত ছিল। MOAB-এর মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি। অর্থাৎ প্রায় ৯.৮ টন। অস্ত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯.১ মিটার এবং ব্যাস প্রায় এক মিটার। এর ভেতরে ব্যবহৃত হয় BLU-120/B ওয়ারহেড। এতে প্রায় ৮ হাজার ৪৮২ কেজি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক থাকে বলে সামরিক প্রযুক্তি-সংক্রান্ত প্রকাশনাগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বোমার মোট ওজন এবং বিস্ফোরকের ওজন এক বিষয় নয়। MOAB-এর বিস্ফোরক শক্তি প্রায় ১১ টন TNT-এর সমতুল্য বলে মার্কিন সামরিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়। এই পরিমাপকে ১১ টন বোমার ওজন হিসেবে বোঝা যাবে না; এটি বিস্ফোরণের শক্তি বোঝানোর একটি তুলনামূলক একক। অস্ত্রটির উন্নয়ন, পরীক্ষা এবং উৎপাদন-সম্পর্কিত ব্যয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও প্রতি ইউনিটের নির্দিষ্ট উৎপাদনমূল্য নিয়ে প্রকাশ্য তথ্য একরকম নয়। তাই ১৫–১৬ মিলিয়ন ডলারের অঙ্ককে নিশ্চিত সরকারি মূল্য হিসেবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
কীভাবে কাজ করে এই বিশাল বোমা?
MOAB একটি GPS-নির্দেশিত বোমা। এর নেভিগেশন ব্যবস্থায় GPS এবং ইনর্শিয়াল নেভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ফলে এটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য পরিচালিত হতে পারে। বোমাটি সাধারণ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পরিবহন বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এর জন্য MC-130H এবং উপযোগী C-130 ধরনের বিমান ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি সাধারণত মাটিতে সরাসরি আঘাত করার আগেই বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি। এর বিস্ফোরণের ফলে প্রবল চাপের তরঙ্গ, তাপ এবং বিস্তৃত এলাকায় ধ্বংসাত্মক অভিঘাত সৃষ্টি হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, MOAB কোনো ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ভেদ করে গভীরে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি প্রচলিত ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা নয়। এটি বৃহৎ এলাকা, গুহা, সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ এবং কিছু গভীরভাবে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নকশা করা হয়েছে। গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিশেষ অস্ত্র রয়েছে—GBU-57 Massive Ordnance Penetrator (MOP)। এটি MOAB-এর মতো বৃহৎ বায়ুবিস্ফোরক বোমা নয়; বরং শক্তিশালী কাঠামো ভেদ করে গভীরে প্রবেশের জন্য তৈরি। এই পার্থক্যটি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আফগানিস্তানে প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার
২০০৩ সালে MOAB প্রথম প্রকাশ্যে আনা হয়। তবে দীর্ঘদিন অস্ত্রটি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়নি। ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) একটি সুড়ঙ্গ ও গুহা নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো MOAB ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। এটি ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে অস্ত্রটির প্রথম বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যবহার। ওই অভিযানে অস্ত্রটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল আইএসের সুরক্ষিত অবস্থান ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে আঘাত হানা। তবে অস্ত্রটির ব্যবহার নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক রয়েছে। এত বড় অ-পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর নয়, আশপাশের বিস্তৃত এলাকার ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে সামরিক প্রয়োজনীয়তা, বেসামরিক নিরাপত্তা এবং মানবিক পরিণতি—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইরানের ‘ফাদার অব অল বম্বস’: বাস্তব অস্ত্র, নাকি সামরিক দাবি?
যুক্তরাষ্ট্রের MOAB-এর বিপরীতে রাশিয়া এবং ইরানও বৃহৎ আকারের অ-পারমাণবিক বিস্ফোরক অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) অ্যারোস্পেস ফোর্সের তৎকালীন প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলী হাজিজাদেহ দাবি করেন, ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থা প্রায় ১০ টন ওজনের একটি বিশাল বোমা তৈরি করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি বলেন, এই বোমা ইরানের অস্ত্রাগারে রয়েছে এবং ইলিউশিন ধরনের বিমান থেকে নিক্ষেপ করা সম্ভব। ইরানি সামরিক কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, অস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের MOAB-এর সঙ্গে তুলনীয় এবং অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সংশোধন প্রয়োজন। ইরানের এই অস্ত্রকে ‘সব ক্ষেপণাস্ত্রের বাবা’ বলা সঠিক নয়। ২০১৭ সালের বক্তব্যে হাজিজাদেহ অস্ত্রটিকে ‘ফাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার বাবা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি এটিকে ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য একটি বোমা হিসেবে বর্ণনা করেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইরানের এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। অস্ত্রটির প্রকৃত বিস্ফোরক শক্তি, নির্ভুলতা, কার্যকর পরিসর কিংবা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য স্বাধীন মূল্যায়ন সীমিত। অতএব, ইরানের ১০ টন ওজনের বোমা থাকার দাবি একটি সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা যায়; কিন্তু এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের MOAB-এর চেয়ে বেশি শক্তিশালী বা সমপর্যায়ের প্রমাণিত অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
রাশিয়ার FOAB: ‘সব বোমার বাবা’
২০০৭ সালে রাশিয়া একটি বৃহৎ অ-পারমাণবিক থার্মোবারিক অস্ত্র পরীক্ষার ঘোষণা দেয়। অস্ত্রটির প্রচলিত নাম FOAB—Father of All Bombs। রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, এই অস্ত্রের বিস্ফোরক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের MOAB-এর প্রায় চার গুণ। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, এতে প্রায় সাত টন বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তবে রাশিয়ার ঘোষিত শক্তির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অস্ত্রটির প্রকৃত কার্যকারিতা, বিস্ফোরক শক্তি এবং পরীক্ষার বিবরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। এখানে MOAB এবং FOAB-এর মধ্যে প্রযুক্তিগত পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। MOAB একটি GPS-নির্দেশিত বৃহৎ উচ্চবিস্ফোরক বোমা। অন্যদিকে রাশিয়ার FOAB-কে থার্মোবারিক বা ফুয়েল-এয়ার ধরনের অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়। থার্মোবারিক অস্ত্র বিস্ফোরণের সময় আশপাশের বায়ুর অক্সিজেন ব্যবহার করে তীব্র তাপ ও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে আবদ্ধ বা আধা-আবদ্ধ স্থানে এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। তবে থার্মোবারিক অস্ত্রের শক্তি এবং প্রচলিত উচ্চবিস্ফোরক বোমার শক্তি সরাসরি তুলনা করা সব সময় সহজ নয়। বিস্ফোরণের ধরন, পরিবেশ এবং লক্ষ্যবস্তুর কাঠামো অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন: যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
ইরানের সামরিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সক্ষমতা। ইরান দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প, মধ্য ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে কাজ করছে। পাশাপাশি দেশটি বিভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক ও নজরদারি ড্রোন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণের প্রধান ক্ষেত্র হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো। এ ধরনের সংঘাতে শুধু বড় বোমা বা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান নয়, বরং তুলনামূলক কম ব্যয়ের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এপি-র সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান ও ইরান-সমর্থিত বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে সামরিক ঘাঁটি, বিমান, জ্বালানি অবকাঠামো এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এ কারণে ইরানের পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত উদ্বেগেরও বিষয়।
MOAB ব্যবহার কি ইরানের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত?
ইরানের বিরুদ্ধে MOAB ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও অস্ত্রটির প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বিবেচনায় বিষয়টি জটিল। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কিছু অংশ গভীর ভূগর্ভে নির্মিত। এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে MOAB ব্যবহার করা হলে তা কতটা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য তথ্য নেই। MOAB-এর মতো বিশাল বোমা বৃহৎ এলাকা এবং কিছু সুরক্ষিত অবস্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ভেদ করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি GBU-57 MOP-এর মতো অস্ত্রের সঙ্গে এর উদ্দেশ্য এক নয়। এ কারণে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানে MOAB ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ ছাড়া এত বড় অস্ত্র ব্যবহার করলে আশপাশের বেসামরিক জনগোষ্ঠী, অবকাঠামো এবং পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক উত্তেজনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি করছে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। ইরান যদি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ চালায়, তাহলে ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুদ্ধের প্রস্তুতি, নাকি কূটনীতির চাপ?
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে। কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পথ খুঁজছে। একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলোচনার টেবিল, এই দ্বৈত পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তবে সামরিক শক্তি প্রদর্শন সব সময় যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয় না। অনেক সময় এটি আলোচনায় প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। একইভাবে ইরানের ১০ টন ওজনের ‘ফাদার অব অল বম্বস’ সম্পর্কেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রযুক্তিগত তথ্য সীমিত। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘বোমার প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ভূরাজনৈতিক জটিলতা বোঝা যাবে না।
বরং প্রশ্নটি এখন আরও বড়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কি আবারও সামরিক সংঘাতের পথে এগোচ্ছে, নাকি ভয়াবহ অস্ত্রের হুমকি ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের নিরাপত্তা এবং বিশ্বজ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ।##

