-- বিজ্ঞাপন ---

ভারত মহাসাগরে পাকিস্তানের নতুন চাল: বহরে যুক্ত হলো প্রথম ‘হ্যাঙ্গর-ক্লাস’ সাবমেরিন

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংহত করতে নৌবাহিনীতে প্রথম ‘হ্যাঙ্গর-ক্লাস’ (Hangor-class) ডিজেল-ইলেকট্রিক অ্যাটাক সাবমেরিন যুক্ত করেছে পাকিস্তান। গত ১১ জুন অত্যাধুনিক এই সাবমেরিনটি, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিএনএস/এম হ্যাঙ্গর’ (PNS/M Hangor), করাচিতে নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটিতে এসে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে সাবমেরিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহরে তার সার্ভিস লাইফ শুরু করল।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাবমেরিন অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে পানির নিচে যুদ্ধক্ষমতা, নজরদারি কার্যক্রম এবং সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে পাকিস্তান আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

মূলত, সাবমেরিনটি গত ৩০ এপ্রিল চীনের একটি শিপইয়ার্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন লাভ করে। এটি পাকিস্তানের জন্য নির্মিত মোট ৮টি হ্যাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিনের মধ্যে প্রথম ইউনিট। ২০১৫ সালে চীনের সঙ্গে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে পাকিস্তান।

চুক্তির শর্তানুযায়ী, ৪টি সাবমেরিন চীনে এবং বাকি ৪টি পাকিস্তানের করাচি শিপইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসে (KS&EW) স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সবগুলো সাবমেরিন পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হবে।

এই সাবমেরিনটির ‘হ্যাঙ্গর’ নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের তৎকালীন ড্যাফনে-ক্লাস সাবমেরিন PNS Hangor (S131) ভারতীয় নৌবাহিনীর অ্যান্টি-সাবমেরিন ফ্রিগেট INS Khukri-কে ডুবিয়ে দিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই এই নতুন ক্লাসের নামকরণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সাবমেরিনটি পাকিস্তানের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ (Second-Strike Capability) নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রায় ২,৮০০ টন ওজনের এই হ্যাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিনটি মূলত চীনের Type 039B Yuan-class সাবমেরিনের আধুনিক এক্সপোর্ট ভার্সন, যা আন্তর্জাতিকভাবে S26P ভ্যারিয়েন্ট নামে পরিচিত। প্রায় ৭৬ মিটার দীর্ঘ এই সাবমেরিন পানির নিচে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ নট গতিতে চলতে সক্ষম। এতে বিশেষ ‘টিয়ার-ড্রপ’ আকৃতির নকশা ব্যবহার করা হয়েছে, যা পানির নিচে চলাচলের সময় ঘর্ষণ ও শব্দ কমাতে সাহায্য করে।

এই সাবমেরিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর Stirling Air-Independent Propulsion (AIP) সিস্টেম। এই প্রযুক্তির কল্যাণে সাবমেরিনটি বারবার ভেসে উঠে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া ছাড়াই পানির নিচে একটানা প্রায় ২১ দিন (৩ সপ্তাহ) সম্পূর্ণ নিঃশব্দে অবস্থান করতে পারে। ফলে শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত গোপনে অপারেশন পরিচালনা করা সম্ভব।

প্রতিরক্ষা খাতের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, এই সাবমেরিনগুলোতে প্রথমে জার্মানির তৈরি MTU 396 ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু জার্মানি পাকিস্তানের কাছে ইঞ্জিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় চীন নিজেদের তৈরি উন্নত CHD620 ইঞ্জিন এতে প্রতিস্থাপন করে। এই কারিগরি পরিবর্তনের কারণে সাবমেরিনটি হস্তান্তরে কিছুটা বিলম্ব হয়।

৩০০ মিটার গভীরতায় ডাইভ দিতে সক্ষম এবং মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ জন ক্রু দ্বারা পরিচালিত এই সাবমেরিনটিতে আধুনিক ব্যাটল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, উন্নত সোনার ও সেন্সর প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। এতে রয়েছে ৬টি ৫৩৩ মিলিমিটার টর্পেডো টিউব।

এই টিউবগুলো থেকে শুধু সাধারণ টর্পেডোই নয়, বরং দূরপাল্লার YJ-18B অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং পাকিস্তানের নিজস্ব পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম Babur-III সাবমেরিন-লঞ্চড ক্রুজ মিসাইল (SLCM) নিখুঁতভাবে উৎক্ষেপণ করা যায়।

সব মিলিয়ে, নতুন এই হ্যাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিন দক্ষিণ এশিয়ার নৌ-ভারসাম্যে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।##