-- বিজ্ঞাপন ---

২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারদের ব্যাপক উত্থানের পূর্বাভাস

শীর্ষে সৌদি আরব, সংখ্যায় রেকর্ড ভারতের

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

আগামী কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে অতিধনীদের (বিলিয়নিয়ার) সংখ্যা এবং তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ অবিশ্বাস্য গতিতে বৃদ্ধি পেতে চলেছে। আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেট ও সম্পদবিষয়ক নামী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নাইট ফ্রাঙ্ক (Knight Frank)-এর সাম্প্রতিক ‘ওয়েলথ রিপোর্ট’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিষ্ট (Visual Capitalist)-এর একটি তুলনামূলক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের এই পূর্বাভাসে দেখা গেছে, প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের ওপর ভর করে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বর্তমান ৩,১১০ জন থেকে ২৫% বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩,৯১৫ জনে পৌঁছাবে। এই বিলিয়নিয়ারদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৮.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে। শতকরা হারের দিক থেকে আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ ও বিলিয়নিয়ার বৃদ্ধি পাবে তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং তেল-বহির্ভূত খাতে বিপুল বিনিয়োগের ফলে দেশটির বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের পরিমাণ ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় ১৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে (২০২৬ সালে) সৌদিতে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ২৩ জন হলেও ২০৩১ সালের মধ্যে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৬৫ জনে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় ইউরোপ ও এশিয়ার আধিপত্যশতকরা হারে বিলিয়নিয়ারদের সম্ভাব্য সম্পদ বৃদ্ধির দৌড়ে সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পোল্যান্ড। মূলত পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে উদীয়মান প্রযুক্ত খাতের বিকাশের কারণে সম্পদ বৃদ্ধির হার হবে ১২৩ শতাংশ। সামগ্রিক তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের ২০৩১ সালের মধ্যে সম্পদ বৃদ্ধির সম্ভাব্য হার ১ম  সৌদি আরব ১৮৩%, ২য় পোল্যান্ড ১২৩%, ৩য় সুইডেন ৮১%, ৪র্থ অস্ট্রেলিয়া ৭৭%, ৫ম ডেনমার্ক ৭৫%, ৬ষ্ঠ জাপান ৬৫%, ৭ম মেক্সিকো ৬৩%, ৮ম ফিলিপাইনস ৬৩%, ৯ম নরওয়ে৫৩% এবং ১০ম ভারত ৫১%।

শীর্ষ ১০-এর মধ্যে নরডিক অঞ্চলের তিনটি দেশ (সুইডেন, ডেনমার্ক ও নরওয়ে) স্থান পাওয়ায় ইউরোপের এই অঞ্চলে ব্যক্তিগত সম্পদ জমার গতিকে প্রতিফলিত করে। একক দেশ হিসেবে সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে থাকবে ভারত । শতকরা হারের দিক থেকে ভারত ১০ম স্থানে (৫১%) থাকলেও, একক দেশ হিসেবে ২০৩১ সালের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিলিয়নিয়ারের জন্ম হবে ভারতে। ২০২৬ সালে ভারতের বিলিয়নিয়ার সংখ্যা ২০৭ জন, যা আগামী পাঁচ বছরে ১০৬ জন বেড়ে ২০৩১ সালে ৩১৩ জনে গিয়ে ঠেকবে।

নাইট ফ্রাঙ্ক-এর বৈশ্বিক গবেষণা প্রধান লিয়াম বেইলি (Liam Bailey) জানান,”আমরা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সম্পদ পুনর্বণ্টন প্রত্যক্ষ করছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন এখনো মূল পরাশক্তি থাকলেও ভারত এবং দ্রুত বিকাশমান কিছু অর্থনীতি এখন বৈশ্বিক ল্যান্ডস্কেপ নতুন করে তৈরি করছে।”

সম্পদ বৃদ্ধির নেপথ্যে কী? অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই অতিধনীদের সম্পদ “সুপারচার্জড” বা দ্রুত গতিশীল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তি খাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এআই-চালিত স্টার্টআপগুলোর কারণে অতি অল্প সময়ে বিশাল ব্যবসা বা সাম্রাজ্য দাঁড় করানো সম্ভব হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিল্পায়ন, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, পুঁজিবাজারের ভালো পারফরম্যান্স এবং মহামারী ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পরও বেসরকারি পুঁজির স্থিতিস্থাপকতা অতিধনীদের সম্পদ তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখছে।বাড়ছে বৈশ্বিক বৈষম্য ও উদ্বেগ বিলিয়নিয়ারদের এই আকাশচুম্বী সম্পদ বৃদ্ধির সমান্তরালে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র আকার ধারণ করছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অক্সফাম (Oxfam)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

সাম্প্রতিক ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট’ অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ০.০০১ শতাংশ (৬০,০০০ জনেরও কম) অতিধনী মানুষের কাছে পৃথিবীর মোট জনগোষ্ঠীর নিচের দিকে থাকা অর্ধেক মানুষের (প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ) সম্মিলিত সম্পদের চেয়ে তিন গুণ বেশি সম্পদ রয়েছে। অতিধনীদের এই অতিমাত্রায় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকেই এখন তাদের ওপর অতিরিক্ত কর (Wealth Tax) আরোপের দাবি তুলছেন।

নাইট ফ্রাঙ্ক-এর এই প্রতিবেদনটি মূলত বর্তমান বাজারের গতি ও অর্থনৈতিক প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে বাস্তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশ্ববাজারের আকস্মিক ওঠানামা, মুদ্রাস্ফীতি কিংবা নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে এই পূর্বাভাসের সংখ্যাগুলো কিছুটা পরিবর্তিত হতেও পারে। তবে সামগ্রিকভাবে আগামী দিনগুলো যে প্রযুক্তিনির্ভর অতিধনীদের হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।##