-- বিজ্ঞাপন ---

পড়াশুনা নিয়ে কথা

কাজী মনসুর#

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে শেখানো যেতে পারে, ভুয়া বার্তা, সন্দেহজনক লিংক, ব্যক্তিগত তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপত্তা। নবম ও দশম শ্রেণিতে যুক্ত হতে পারে অনলাইন কেনাকাটা, মোবাইল আর্থিক সেবা, ভুয়া পুরস্কার, পরিচয় চুরি এবং বিনিয়োগের প্রতারণা। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে আসতে পারে বিদেশে চাকরি, ভুয়া নিয়োগপত্র, অনলাইন বিনিয়োগ, ডিজিটাল মুদ্রা, অর্থপাচার এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিষয়টি আরো বিস্তৃত হয়ে ডিজিটাল যাচাই, সাইবার অপরাধ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং প্রতারণার শিকার ব্যক্তিকে সহায়তার দিকে যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শুধু বই পড়িয়ে নয়, বাস্তব পরিস্থিতি দিয়ে শেখানো যেতে পারে। ‘তুমি ৫০ লাখ টাকা জিতেছ, আগে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাও।’ ‘দুবাইয়ে দুই লাখ টাকা বেতনের চাকরি, আগে ৮০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি।’ ‘আমি বিপদে আছি, এখনই টাকা পাঠাও।’ প্রতিটি বার্তার পর প্রশ্ন হবে, কী সন্দেহজনক? কীভাবে যাচাই করব? কার কাছে যাব? টাকা পাঠানোর আগে কী প্রমাণ চাইব? এ শিক্ষা একটি শিশুকে শুধু প্রতারণা থেকে রক্ষা করবে না; তাকে ভবিষ্যতের ডিজিটাল নাগরিক হিসেবেও প্রস্তুত করবে।
ভুক্তভোগীকে দোষী বানালে অপরাধী আরো শক্তিশালী হয়, স্ক্যামের শিকার মানুষকে প্রায়ই বলা হয়, ‘লোভ করেছে’, ‘বোকা ছিল’, ‘সচেতন ছিল না’। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। কারণ আধুনিক প্রতারণা মানুষের মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে। উন্নত প্রযুক্তির দেশেও মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি মানিস্মার্টও সতর্ক করছে যে প্রতারণামূলক ওয়েবসাইট এখন অত্যন্ত পেশাদার ও বিশ্বাসযোগ্য দেখতে হতে পারে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি উপাদান ব্যবহার করতে পারে। তাই প্রতারণার শিকার হওয়া মানেই ভুক্তভোগীর অযোগ্যতা নয়। আর স্ক্যামকেন্দ্র থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষদের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। কেউ স্বেচ্ছায় অপরাধে যুক্ত হতে পারে, আবার কেউ চাকরির প্রলোভনে বিদেশে গিয়ে পাসপোর্ট হারিয়ে, চলাচলের স্বাধীনতা হারিয়ে জোরপূর্বক অন্যকে প্রতারণা করতে বাধ্য হতে পারে। তাই প্রত্যেককে একই পরিচয়ে বিচার না করে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে- কে সংগঠক, কে সহযোগী এবং কে নিজেই মানবপাচার বা জবরদস্তির শিকার।
বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন সামনে এসে দাড়িয়েছে। প্রতারণা প্রতিরোধ এখন আর শুধু পুলিশের কাজ নয়। বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা ঠেকাতে নিয়োগব্যবস্থাকে কতটা কঠোর করা হবে? ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবায় সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর কত দ্রুত অর্থ আটকে দেওয়া যাবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন শনাক্ত হলে প্রযুক্তি কোম্পানি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় কত দ্রুত হবে? কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গিয়ে স্ক্যামকেন্দ্রে আটকা পড়লে তাকে অপরাধী হিসেবে দেখার আগে মানবপাচারের সম্ভাবনা যাচাই করার ব্যবস্থা আছে কি? একটি প্রতারণার অর্থ বিদেশে চলে গেলে তা ফেরত আনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কত দ্রুত পাওয়া যাবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রতারণা হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতারণা হওয়ার আগেই মানুষকে সতর্ক করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু পুলিশকে দিতে হবে না। শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র, আর্থিক খাত, মুঠোফোন অপারেটর, প্রযুক্তি কোম্পানি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক নীতিরও পরিবর্তন দরকার, স্ক্যাম যখন আন্তর্জাতিক, তখন প্রতিরোধের কাঠামোকেও আন্তর্জাতিক হতে হবে। দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের তথ্য দ্রুত বিনিময়, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের জন্য দ্রুত আইনি সহযোগিতা, অপরাধীদের ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও হিসাব শনাক্তে প্রযুক্তি কোম্পানির সহযোগিতা, মানবপাচার ও স্ক্যামকেন্দ্রের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় এবং অবৈধ অর্থের গতিপথ অনুসরণ, এসব বিষয়ে আরো দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অপরাধের ব্যবসায়িক মডেল ভাঙতে হবে। যে বিজ্ঞাপন মানুষকে ফাঁদে ফেলছে, সেটি বন্ধ করতে হবে। যে হিসাব টাকা নিচ্ছে, সেটি শনাক্ত করতে হবে। যে প্রযুক্তি অপরাধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তার অপব্যবহার ঠেকাতে হবে। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জেনে-শুনে অপরাধী নেটওয়ার্ককে সহায়তা করছে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর যে মানুষটি প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তাকে দ্রুত সহায়তা দিতে হবে।
স্ক্যাম থাকবে, শুধু রূপ বদলাবে; স্ক্যাম থাকবে, শুধু তার ভাষা বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, পরিচয় বদলাবে, পদ্ধতি বদলাবে। একসময় প্রতারণার চিঠি আসত ডাকযোগে। পরে এল টেলিফোনে, খুদে বার্তায়, ই-মেইলে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিনিয়োগ, ডিজিটাল মুদ্রা ও কৃত্রিম পরিচয়। সামনে হয়তো আসবে এমন প্রতারণা, যেখানে আপনার পরিচিত মানুষের কণ্ঠ, মুখ এবং ভাষা, সবই নকল করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রতারণার মূল চরিত্র খুব বেশি বদলাবে না। মানুষের ভয়, লোভ, বিশ্বাস, একাকিত্ব, অসহায়ত্ব এবং দ্রুত সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই ব্যবহার করা হবে। তাই প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতাও তত উন্নত হতে হবে। কেউ জরুরি অর্থ চাইলে, যাচাই করতে হবে। কেউ অস্বাভাবিক লাভের প্রস্তাব দিলে, প্রমাণ চাইতে হবে। কেউ বিদেশে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিলে, প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাই করতে হবে। কেউ পরিচিত মানুষের কণ্ঠে সাহায্য চাইলে, অন্য মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। আর প্রতারণার শিকার হলে লজ্জায় চুপ না থেকে দ্রুত অভিযোগ করতে হবে। কারণ প্রতারণা ঠেকানোর প্রথম পদক্ষেপ অনেক সময় কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়। সেটি একটি সাধারণ প্রশ্ন, ‘আমি কি নিশ্চিত, এই কথাটি সত্য।।।