যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য, সিঙ্গাপুরের উত্থান, বাংলাদেশের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
QS World Rankings 2027
কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান University of Dhaka–কে কেন্দ্র করে এবারের বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা Quacquarelli Symonds (QS) প্রকাশ করেছে বহুল আলোচিত “QS World University Rankings 2027”, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বশেষ অবস্থান উঠে এসেছে।
এবারের র্যাংকিংয়ে মোট ১০৬টি দেশ ও অঞ্চলের ১,৫০৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান University of Dhaka আবারও জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব ধরে রাখলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অবস্থান পিছিয়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্বসেরা আবারও MIT, টানা ১৫ বছর শীর্ষে
র্যাংকিংয়ের শীর্ষে এবারও কোনো পরিবর্তন আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের Massachusetts Institute of Technology (MIT) টানা ১৫তম বারের মতো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণ ১০০ স্কোর অর্জন করেছে, যা গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষার মান এবং বৈশ্বিক প্রভাবের ক্ষেত্রে তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানকে আবারও প্রমাণ করেছে।
দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে, যুক্তরাজ্যের Imperial College London, যুক্তরাষ্ট্রের Stanford University। উভয় প্রতিষ্ঠানই ৯৯.২ স্কোর অর্জন করেছে, যা তাদের বৈশ্বিক একাডেমিক উৎকর্ষতার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
শীর্ষ ১০০-তে দেশভিত্তিক আধিপত্য
QS র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০০ তালিকায় দেশভিত্তিক আধিপত্যে আবারও এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ১০০-তে স্থান পেয়েছে। এরপর রয়েছে—যুক্তরাজ্য: ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়,অস্ট্রেলিয়া: ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়,চীন (মূল ভূখণ্ড ও হংকং): ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়,জার্মানি: ৪টি,ফ্রান্স: ৪টি,কানাডা: ৪টি
জাপান: ৪টি। এছাড়া সুইজারল্যান্ড ও সুইডেন থেকে ৩টি করে, সিঙ্গাপুর ও নেদারল্যান্ডস থেকে ২টি করে বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ১০০-তে জায়গা করে নিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে—গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় উন্নত দেশগুলো এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে রয়েছে।
এশিয়ার অবস্থান: সিঙ্গাপুর এগিয়ে
এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির National University of Singapore বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ১০ম স্থান অর্জন করেছে, যা এশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, চীনও তার অবস্থান আরও শক্ত করেছে। মূল ভূখণ্ড ও হংকং মিলিয়ে মোট ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ১০০-তে রয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি আবারও হতাশাজনক চিত্র—কারণ কোনো দেশই শীর্ষ ১০০-তে স্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।
দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা: পিছিয়ে থাকা উচ্চশিক্ষা
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতের Indian Institute of Technology Delhi সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকলেও সেটি রয়েছে ১১৮তম স্থানে। ভারত মোট ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তালিকায় থাকলেও টপ ১০০-তে জায়গা না পাওয়া দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে— পাকিস্তান: ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠান: Quaid-i-Azam University (৩৮১তম),শ্রীলঙ্কা: ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়। নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান: কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই মূল তালিকায়। এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও গবেষণা ঘাটতির দিকটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান: ১৩ বিশ্ববিদ্যালয়, নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ থেকে এবারের QS World University Rankings 2027-এ মোট ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। যদিও বৈশ্বিক টপ ১০০-তে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, তবুও জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব ধরে রেখেছে University of Dhaka। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবারও বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এটি বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ৬০০-এর মধ্যে অবস্থান করছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষার মধ্যে সর্বোচ্চ।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শত বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের নেতৃত্ব, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে আরও এগিয়ে যেতে হলে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যান্য দেশের পারফরম্যান্স
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলো গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এগিয়ে,যুক্তরাষ্ট্র এখনো উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি গবেষণায় নেতৃত্বে,চীন দ্রুত উন্নতি করে শীর্ষ প্রতিযোগীদের কাতারে উঠে এসেছে। এই প্রতিযোগিতা বিশ্ব উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করেছে, যেখানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এখন বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত উন্নয়ন করছে।
বিশ্লেষণ: কেন পিছিয়ে দক্ষিণ এশিয়া?
বিশেষজ্ঞদের মতে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণগুলো হলো, গবেষণা ও উদ্ভাবনে কম বিনিয়োগ,আন্তর্জাতিক জার্নালে কম প্রকাশনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা,আধুনিক ল্যাব ও অবকাঠামোর ঘাটতি,শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ দুর্বলতা। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি নীতি, শক্তিশালী ফান্ডিং এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
QS World University Rankings 2027 আবারও প্রমাণ করেছে যে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। উন্নত দেশগুলো যেখানে গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় এগিয়ে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়া এখনও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো University of Dhaka–এর মতো প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানে আরও শক্তিশালী করা। সঠিক নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে আরও উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।##

