সিরাজুর রহমান#
তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের বিমান বাহিনীকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করে তোলার জন্য ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় কৌশলগত প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দের কারণে দেশটি আজ নতুন প্রযুক্তি, উন্নত যুদ্ধবিমান এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
আর এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বাস্তবায়নে তুরস্ক আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং নিজস্ব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল অবলম্বন করছে। প্রথমত, তুরস্ক তার বিমান বাহিনির আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪০টি F-16 ব্লক 70 যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
এই এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সঙ্গে উন্নত রাডার, অ্যাভিওনিক্স ও প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্যাকেজ যুক্ত থাকবে। এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও হস্তান্তর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করায় এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাণিজ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দ্বিতীয়ত, তুরস্ক বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ২০টি নতুন ইউরোফাইটার টাইফুন সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা করছে। যার প্রাথমিক চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১০.৭ বিলিয়ন ডলার। আবার অন্যদিকে একই সঙ্গে কাতার এবং ওমানের ব্যবহৃত ২৪টি পুরোনো ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
যেহেতু টাইফুন ফাইটার জেট একটি যৌথ ইউরোপীয় প্রকল্প, তাই ব্যবহারকারী দেশগুলোকে অন্য দেশের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নির্মাতা দেশগুলোর সম্মিলিত অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে কাতারের পুরোনো ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান পেতেও তুরস্ককে যথেষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এর পাশাপাশি তুরস্ক নিজেদের উন্নত প্রযুক্তির KAAN স্টেলথ ফাইটার প্রকল্পকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটি প্রথম পর্যায়ে ২০টি KAAN জেট সংগ্রহের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯-৩০ সালের দিকে এর প্রথম ব্যাচ বিমান বাহিনীর হাতে পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তুরস্কের মূল লক্ষ্য হলো এই মডেলকে ধীরে ধীরে বিমান বাহিনীর মূল ফাইটার জেট প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা।
এই KAAN স্টেলথ ফাইটার প্রকল্প বাস্তবায়নে তুরস্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর নিজস্ব প্রযুক্তির জেট ইঞ্জিন তৈরি করা নিয়ে জটিলতা। বিশেষ করে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ইঞ্জিন TF-6000 বা TF-35000-কে এখনো পর্যন্ত ম্যাসিভ প্রোডাকশন লাইনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। যা আগামী ২০২৮ সালের আগেই সম্ভব হবে বলে আশাবাদী দেশটি।
তবে তুরস্ক একসময় বহুজাতিক F-35 স্টেলথ ফাইটার প্রকল্পের অন্যতম অংশীদার ছিল এবং এই প্রোগ্রামে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগও করেছিল। পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি সমন্বয়ের বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হওয়ায় গত ২০১৯ সালের দিকে এই প্রজেক্ট থেকে আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন দেশটিকে বাদ দিয়ে দেয়।
বিশেষ করে গত ২০১৭ সালের দিকে রাশিয়ার S-400 প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের পর নিরাপত্তা সামঞ্জস্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, যার ধারাবাহিকতায় তুরস্ককে এফ-৩৫ প্রজেক্টে রাখতে চায়নি আমেরিকাসহ এর মূল অংশীদার দেশগুলো। যদিও বর্তমানে আমেরিকার সাথে তুরস্কের ইতিবাচক ও সফল কূটনৈতিক আলোচনায় এসব বিষয়ে ভবিষ্যতে সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।
বর্তমানে তুরস্কের বিমান বাহিনী সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে F-16 ফাইটিং ফ্যালকন-এর ওপর। তাদের বিমান বহরে রয়েছে প্রায় ২৪৩টি F-16 ব্লক 30/40 এবং ৪৮টি পুরোনো F-4 ফ্যান্টম যুদ্ধবিমান। নতুন বিমান যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মগুলোই আপাতত দেশটির এয়ার কমব্যাট বা অপারেশনাল সক্ষমতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক নিজস্ব প্রযুক্তির কমব্যাট ড্রোন, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে উন্নত ফাইটার জেট ডিজাইন ও তৈরিতে তুরস্ক অনেকটাই এগিয়ে গেলেও নিজস্ব জেট ইঞ্জিন এবং ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতা এখনো অনেকটাই সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে। তাই কিছুটা ধীরে হলেও তুরস্ক তার KAAN এয়ারক্রাফট প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, তুরস্কের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ যেমন গ্রিস বা ইসরাইল আজ নিজেদের বিমান বাহিনীকে প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ফলে তুরস্ককেও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে তার পরিকল্পনাগুলো সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।
মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় আঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এই আধুনিকায়ন তুরস্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। যার ফলে দেশটি আজ নিজস্ব ড্রোন, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং মিসাইল প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটি আধুনিক এবং ডেডিকেটেড বিমান বাহিনী গড়ে তুলতে চায়।
পরিশেষে বলা যায়, তুরস্ক নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ, নিজস্ব স্টেলথ ফাইটার উন্নয়ন, ব্যবহৃত বিমান কেনা এবং প্রযুক্তিগত আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সহযোগিতা বা উদ্যোগ সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী বিমান বাহিনী গঠনের লক্ষ্য নিয়ে এবার এগিয়ে যাচ্ছে তারা। তবে দেশটির এই প্রক্রিয়াটি ধীরে এগোলেও তা বাস্তবসম্মত এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই রয়েছে।##তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, আল জাজিরা, ডিফেন্স নিউজ, বিবিসি, রয়টার্স
-- বিজ্ঞাপন ---

