কাজী আবুল মনসুর#
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সন্ধিক্ষণে মানবসভ্যতা এমন এক প্রযুক্তির মুখোমুখি, যার রূপান্তরকামী প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। এটি ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। আজ এআই কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর কোনো ধারণা কিংবা নিছক কোনো টুলের নাম নয়; বরং এটি বৈশ্বিক কাঠামোর খোলনলচে বদলে দেওয়ার এক মোক্ষম হাতিয়ার। শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও উচ্চতর গবেষণা, এমন কোনো খাত নেই যেখানে এআই তার আধিপত্য বিস্তার করেনি। তবে এই অভূতপূর্ব সম্ভাবনার সমান্তরালে ডানা মেলছে কিছু অস্তিত্ব সংকটের শঙ্কাও।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও এআই-এর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ
বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এই প্রযুক্তিকে করায়ত্ত করে নিজেদের উৎপাদনশীলতা ও কৌশলগত সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ভারতের মতো দেশগুলো চিকিৎসা থেকে শুরু করে সীমান্ত প্রতিরক্ষা পর্যন্ত সবখানে স্বয়ংক্রিয় রোবটিক্স ও অটোনোমাস সিস্টেমের বাস্তব প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণও এখন এআই-এর ইশারায় নির্ধারিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিংবা ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে অটোনোমাস কমব্যাট ড্রোন, স্মার্ট মিসাইল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের ব্যবহার প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক যুদ্ধের চালিকাশক্তি এখন মানুষের হাত থেকে প্রযুক্তির মগজে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ভুল ও বাস্তবতার দূরত্ব
দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এআই-এর পরিধিকে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, ছবি বা ভিডিও এডিট করা, গল্প লেখা কিংবা কৃত্রিম কণ্ঠস্বর (Voice cloning) তৈরি করাই বোধহয় এআই-এর দৌড়। কিন্তু মহাকাশ গবেষণা, নিখুঁত চিকিৎসাসেবা, আধুনিক কৃষি উৎপাদন কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ব্যবস্থাপনায় এআই-এর যে গভীর ও বিস্তৃত উপযোগিতা রয়েছে, তা আমাদের ভাবনায় এখনো অধরা। একে কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ মনে করলে আমরা মারাত্মক ভুল করব।
ইতিহাসের শিক্ষা ও আসন্ন কর্মসংস্থান বিপর্যয়
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘Future of Jobs Report’-এর পরিসংখ্যান আমাদের এক চরম সতর্কবার্তা দেয়—আগামী কয়েক বছরে অটোমেশনের গ্রাসে বিলুপ্ত হতে চলেছে কোটি কোটি প্রচলিত কর্মসংস্থান। আমরা যদি এআই-কে একটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের মহাবিপ্লব হিসেবে গ্রহণ না করি, তবে ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ঠিক যেভাবে ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রশাসন ও প্রযুক্তির মূলস্রোত থেকে ছিটকে পড়েছিলেন, এবারও এআই-কে অবহেলা করলে আমরা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক দাসত্বে শৃঙ্খলিত হব।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের রোডম্যাপ
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রযুক্তির এই আগ্রাসী জোয়ারের মুখে টিকে থাকতে হলে আমাদের কৌশলগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনা জরুরি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের করণীয়:
শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর: কেবল ‘ডিগ্রিধারী’ বেকার তৈরি না করে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে কোডিং, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং এআই-ভিত্তিক প্রায়োগিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্রেফ প্রযুক্তির ‘গ্রাহক’ বা ব্যবহারকারী না বানিয়ে, তাদের ‘উদ্ভাবক’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শিল্প ও একাডেমিয়ার মেলবন্ধন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাগারকে দেশের শিল্পখাতের (Industry-Academia collaboration) সাথে সরাসরি সংযুক্ত করতে হবে। তাত্ত্বিক পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে তরুণরা যেন পাস করার আগেই বাস্তবমুখী প্রজেক্ট ও রোবটিক্স গবেষণায় নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারে।
গবেষণায় (R&D) কৌশলগত বিনিয়োগ: প্রযুক্তি আমদানির ওপর অতিনির্ভরশীলতা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশকে পঙ্গু করে দেয়। চীন কিংবা আমেরিকার মতো বিশাল বাজেট আমাদের না থাকলেও, জাতীয় বাজেটে নিজস্ব ডেটা অবকাঠামো এবং নিবিড় গবেষণার (R&D) জন্য একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল বরাদ্দ রাখতে হবে।
আইনি ও নৈতিক কাঠামো: এআই-এর অপব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডেটা চুরি রুখতে অবিলম্বে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় এআই এবং ডেটা সার্বভৌমত্ব নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আর দূরের কোনো সম্ভাবনা নয়, এটি এক অনিবার্য ও রূঢ় বাস্তবতা। বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমরা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারির অনুগামী হয়ে থাকতে পারি না। প্রযুক্তি ধার করে কখনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন নিজস্ব দক্ষ মানবসম্পদ। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের মেধাবী তরুণ সমাজ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং দূরদর্শী নীতিনির্ধারণের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। আজ আমরা প্রযুক্তিকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীদিনের পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব।

