-- বিজ্ঞাপন ---

থিয়েটার থেকে রাজপথ: কে এই নেহা বোরা?

কাজী মনসুর#

পুলিশের ব্যারিকেড সামনে। চারদিকে উত্তেজনা। বিক্ষোভকারীদের পথ আটকে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে একজন তরুণী মাইক্রোফোন হাতে সামনে এগিয়ে এসে ঘোষণা দিলেন, আন্দোলন থামবে না। তাঁকে আটক করা হলেও আন্দোলনকারীদের ঘরে ফিরে যেতে বললেন না; বরং অন্যত্র জড়ো হয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেন। পরে আটকাবস্থায় প্রকাশিত একটি ভিডিওবার্তায় তাঁর সংক্ষিপ্ত ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে,‘আমি আটক আছি, আন্দোলন নয়।’ কথাটি শুধু একটি প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না; হয়ে উঠেছিল আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের প্রকাশ। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মধ্যে এভাবেই আলোচনায় উঠে এসেছেন নেহা বোর। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণী কোনো চলচ্চিত্র তারকা নন, নন ভারতের ক্ষমতাসীন দলের কোনো রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী। তিনি একজন গবেষক, থিয়েটারপ্রেমী এবং বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি। কিন্তু কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকক্ষ থেকে রাজপথে এলেন তিনি? কেন তাঁর বক্তব্য ও প্রতিবাদের ভিডিও নিয়ে এত আলোচনা? আর কেনই বা ভারতের তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রসঙ্গ জড়িয়ে গেল? নেহা বোরার গল্পের সূত্র খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় তাঁর থিয়েটারের দিনগুলোতে।

মঞ্চে শুরু, রাজনীতিতে প্রবেশ

নেহা বোরার বেড়ে ওঠা ভারতের উত্তরাখণ্ডে। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় শৈশবে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। পড়াশোনার একপর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গেও ছিলেন। পরে দিল্লির হিন্দু কলেজে সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং এরপর ড. বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। তাঁর জীবনপথের এই পরিচয়টিই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ, যে বিষয় নিয়ে তিনি গবেষণা করেন, সেটির সঙ্গেই যুক্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন নেহা। নাটকের চরিত্রের মধ্য দিয়ে ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষের জীবন, চিন্তা ও অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতেন। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, বাস্তব জীবনে কোনো মানুষের সঙ্গে মতের অমিল থাকতে পারে, এমনকি তাঁকে অপছন্দও হতে পারে; কিন্তু থিয়েটারে সেই চরিত্রকে ধারণ করতে গেলে বুঝতে হয়, মানুষটি কেন এমন আচরণ করেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতার পেছনে কী রয়েছে। এই উপলব্ধি নেহার রাজনৈতিক চিন্তায়ও ভূমিকা রেখেছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়। থিয়েটার তাঁকে শুধু মঞ্চে কথা বলতে শেখায়নি; অন্যের অবস্থান বোঝার একটি দৃষ্টিভঙ্গিও দিয়েছে। পরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়া, মানুষের অভিযোগ শোনা এবং রাজনৈতিক প্রশ্নকে সাধারণ মানুষের ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে।

যে ঘটনা বদলে দিল তাঁর রাজনৈতিক পথ

নেহা বোরার রাজনৈতিক সক্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৯-২০ সালের নাগরিকত্ব আইনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে তখন দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, আইনটি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের সুযোগে বৈষম্য তৈরি করতে পারে; সরকার অবশ্য আইনটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের একাংশ এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে। নেহা তখন দেখেন, তাঁরই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্নে সরাসরি অবস্থান নিচ্ছেন। বই, চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্রে দেখা ধারণাগুলো বাস্তব জীবনের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সক্রিয় করে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে শুধু পড়াশোনা বা আলোচনা করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে নিজের অবস্থানও প্রকাশ করতে হয়। এরপর তিনি ছাত্ররাজনীতিতে আরও সক্রিয় হন এবং এআইএসএর সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিত এবং ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে আন্দোলন করে। সময়ের সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্বে উঠে আসেন নেহা এবং জাতীয় সভাপতির দায়িত্ব পান। তবে তাঁর পরিচয় কেবল একটি ছাত্রসংগঠনের পদে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টাও তাঁর কর্মকাণ্ডের একটি বৈশিষ্ট্য।

পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস থেকে ভোটাধিকার

নেহা বোরার পরিচিতি বেড়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে তিনি সরব হয়েছেন। চলতি বছরের পরীক্ষাসংক্রান্ত অনিয়মের প্রতিবাদে তাঁর বক্তব্য ও কর্মসূচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় তাঁর বক্তব্যের একটি সাধারণ সূত্র ছিল—শিক্ষার্থী ও তরুণদের সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে দেখা। কোনো পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ শুধু পরীক্ষার্থীদের ক্ষতি করে না; তা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাকেও দুর্বল করতে পারে। একইভাবে, কর্মসংস্থানের সংকট শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বিষয় নয়; তা অর্থনীতি, নীতিনির্ধারণ ও সুযোগের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নেহা এই ধরনের ইস্যুতে বক্তব্য দেওয়ার সময় সাংবিধানিক অধিকার, বৈষম্য ও জবাবদিহির প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তাঁর বক্তৃতা কখনো হিন্দিতে, কখনো ইংরেজিতে; কথোপকথনে তুলনামূলক শান্ত স্বভাবের হলেও জনসভায় তাঁর বক্তব্য অনেক বেশি দৃঢ় ও প্রত্যক্ষ। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে আন্দোলনকারীদের কাছে পরিচিত করেছে। তবে তাঁর জনপ্রিয়তা কতটা বিস্তৃত, তা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবু সাম্প্রতিক প্রতিবাদে তাঁর উপস্থিতি এবং আটক হওয়ার ঘটনাগুলো তাঁকে ভারতের ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

কেন এখন নেহা বোরাকে নিয়ে এত আলোচনা?

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নেহা বোরার নাম আরও বেশি সামনে আসে। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ায় যোগ্য ভোটারদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমের হিসাবে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়। নির্বাচন কমিশন অবশ্য কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। এই বিতর্কের মধ্যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত তরুণদের আন্দোলন নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভের ডাক দেয়। নেহা বোরাও সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিবাদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দিল্লিতে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরের দিকে বিক্ষোভকারীদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হলে তিনি তাঁদের অন্যত্র জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। পরে তাঁকে আটক করা হয়, যদিও শনিবারই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে। আটকাবস্থাতেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার তাঁর আহ্বান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে নেহার পরিচিতি ছাত্রসংগঠনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনায় প্রবেশ করে। তবে ভোটার তালিকা নিয়ে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান,প্রতিটি বিষয় আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না; আবার অভিযোগের গুরুত্ব যাচাই না করেও তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

‘ভয় ছড়ায়, আশাও ছড়ায়’

নেহা বোরার বক্তব্যের মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়,তিনি শুধু ক্ষোভের ভাষায় কথা বলেন না, আন্দোলনে আশার ভূমিকাও তুলে ধরেন। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ভয় যেমন সংক্রামক হতে পারে, আশাও তেমনি ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষের মধ্যে সাহস তৈরি হয় যখন তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সাহস দেখানো সম্ভব। এই বক্তব্য তাঁর আন্দোলন-ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। রাজনৈতিক আন্দোলনে ক্ষোভ মানুষকে একত্র করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অংশগ্রহণ বজায় রাখতে শুধু ক্ষোভ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, সংগঠিত হওয়ার সুযোগ এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশ্বাস। নেহার মতে, সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে বুঝতে হলে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হতাশা, অসন্তোষ ও প্রত্যাশার কথাও বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ কিংবা ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ—এসব বিষয় এক নয়; কিন্তু আন্দোলনকারীদের একটি অংশ এগুলোকে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করছে। এই জায়গাতেই নেহার মতো ছাত্রনেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁরা বিভিন্ন অভিযোগকে এক ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেন। সেই ভাষা কতটা মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে, আন্দোলন কতটা বিস্তৃত জনসমর্থন পায় এবং দাবিগুলোর কী পরিণতি হয়,সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই নেতৃত্বের স্থায়ী প্রভাব।

বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলন কেন তাঁর বক্তব্যে?

নেহা বোরাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের আরেকটি কারণ বাংলাদেশ। ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের একটি ছাত্রসংগঠনের সম্মেলনে পাঠানো ভিডিওবার্তায় তিনি বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের তরুণেরা তাঁদের পথ দেখিয়েছেন। এই বক্তব্যের পর ভারতের রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়। বিজেপির নেতারা তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করেন এবং একে ভারতের সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এসেছে। তবে বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলা এবং ভারতে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিণতি ঘটানোর পরিকল্পনা করা এক বিষয় নয়। নেহার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে তাঁর কথার পূর্ণ প্রেক্ষাপট, তিনি কোন সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং কী অর্থে ‘পথ দেখানো’র কথা বলেছেন—এসব বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন ভারতীয় তরুণদের আলোচনায় এসেছে, এটি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ঘটনা। প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হুবহু ভারতের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্ত হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই। দুই দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া আলাদা। নেহা বোরার বক্তব্য তাই একই সঙ্গে তরুণদের পারস্পরিক সংহতির ইঙ্গিত এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।

নেহা বোরার সামনে কী পথ?

আজ নেহা বোরার পরিচয়ের দুটি দিক পাশাপাশি রয়েছে। একদিকে তিনি থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজের গবেষক, অন্যদিকে একটি জাতীয় ছাত্রসংগঠনের সভাপতি এবং বিভিন্ন প্রতিবাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। তাঁর জীবনপথে থিয়েটার থেকে রাজনীতিতে আসার বিষয়টি আকর্ষণীয় হলেও তাঁকে শুধু একজন প্রতিবাদী তরুণী হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। তাঁর উত্থানের পেছনে রয়েছে ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কাজ, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনের সময়কার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা বিতর্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করার অধিকারও রয়েছে; গণতান্ত্রিক আলোচনায় কোনো আন্দোলনকারীই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। নেহা বোরার জনপ্রিয়তা কত দূর যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ, তাঁর সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি এবং তরুণদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন,সবই সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। তবে তাঁর উত্থান একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: ভারতের তরুণদের একাংশ কেন নতুন রাজনৈতিক মুখের দিকে তাকাচ্ছে? এর উত্তর শুধু নেহা বোরার ব্যক্তিত্বে নেই; রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের মধ্যেও। থিয়েটারের মঞ্চে অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে শেখা এক গবেষক আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে সেই অভিজ্ঞতাগুলোর রাজনৈতিক অর্থ খুঁজছেন। নেহা বোরার গল্প তাই কেবল একজন ছাত্রনেত্রীর পরিচিতি নয়; এটি ভারতের তরুণদের একাংশের আশা, ক্ষোভ, প্রশ্ন এবং নিজেদের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠার চেষ্টারও একটি প্রতিচ্ছবি।