কাজী মনসুর#
“যে দেশের তরুণেরা অধিকারের টানে রাজপথে নামে, সে দেশের আকাশে-বাতাসে কেবল আশঙ্কার নয়, এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক জাগরণের বার্তাও ভাসে।”
১০ অক্টোবর, ২০২৬। ভারতের রাজধানী দিল্লি আজ কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং এক তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চ। যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথজুড়ে ব্যারিকেড, বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য, বন্ধ মেট্রো স্টেশন এবং মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ। যে সমাবেশে তরুণদের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল, সেই সমাবেশে পৌঁছানোর আগেই বহু মানুষকে আটক করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের মতো পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘিরেও তৈরি হয় উত্তেজনা। তাঁদের সঙ্গে আটক হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী, অধিকারকর্মী ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাদের অনেকে। ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজ থেকেই আটক হন বলে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস।
প্রতিবাদের কেন্দ্রীয় দাবি, ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। আর সেই দাবির পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কি লাখ লাখ, এমনকি কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়ছে? নাকি নির্বাচন কমিশনের ভাষায়, এটি ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন ও হালনাগাদ করার একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ?
এই প্রশ্নের উত্তর ঘিরেই এখন উত্তপ্ত ভারতের রাজনীতি। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন,গণতন্ত্রে নাগরিকের অভিযোগের জবাব কি আরও স্বচ্ছতা দিয়ে দেওয়া হবে, নাকি প্রতিবাদ ঠেকানোর জন্য আরও কঠোর হবে রাষ্ট্রযন্ত্র?
ককরোচ আন্দোলন: অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে রাজপথের শক্তি
ককরোচ জনতা পার্টি, নামটির মধ্যেই রয়েছে প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি ব্যঙ্গের ইঙ্গিত। সংগঠনটির উত্থান ঘটে অনলাইন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও তরুণদের ডিজিটাল যোগাযোগের পরিসর থেকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যোগ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো বিষয়কে সামনে এনে সংগঠনটি তরুণদের একটি অংশের সমর্থন অর্জন করে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও তাঁর সহযোগীরা এবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ডাক দেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকার মতো একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক নথি সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে এত বড় বিতর্ক তৈরি হলে তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে। শুধু প্রশাসনিক ঘোষণা দিয়ে নাগরিকের সন্দেহ দূর করা সম্ভব নয়।
এই আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক হলো, এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে তরুণদের নিজস্ব ভাষা, অনলাইন প্রচার ও ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আন্দোলনটি কেবল কোনো দলের কর্মসূচি হিসেবে নয়, তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন একটি ধরন হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।
তবে ককরোচ আন্দোলনকে পুরো ভারতীয় তরুণসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী আন্দোলন বলা এখনই যথাযথ হবে না। এর প্রকৃত জনসমর্থন, ভৌগোলিক বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব বুঝতে আরও তথ্য প্রয়োজন। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সংগঠনটি এমন একটি ইস্যুকে সামনে এনেছে, যা ইতিমধ্যে বিরোধী দলগুলোরও প্রধান দাবিতে পরিণত হয়েছে।
১৩ কোটি নাম বাদ: ভোটার তালিকার বিতর্ক কোথায়?
আন্দোলনের পেছনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) কর্মসূচি।
রয়টার্স এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া শ্রেণিবিন্যাসে রয়েছে—যাঁরা স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গেছেন, যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, মৃত ভোটার এবং একাধিকবার তালিকাভুক্ত বা ডুপ্লিকেট নাম।
অর্থাৎ, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যাটি বড় হলেও, বাদ পড়া প্রত্যেক ব্যক্তি যে জীবিত, যোগ্য ভোটার ছিলেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু এই সংখ্যা থেকে টানা যায় না।
কিন্তু বিতর্কের মূল জায়গাটিও এখানেই।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় যথাযথ নোটিশ, নথি যাচাই এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু এবং বারবার বাসস্থান পরিবর্তন করেন এমন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও নির্ধারিত সময়ে হাজির হওয়া কঠিন হতে পারে। বিরোধীদের আশঙ্কা, এভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়লে নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করছেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার উদ্দেশ্য হলো মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম চিহ্নিত করা। কমিশন জানিয়েছে, যোগ্য ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া একটি পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা। কিন্তু এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, কতজন প্রকৃত ভোটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং কোথায় অনিয়ম হয়েছে—সেসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে নথি, আপিলের ফলাফল ও স্বাধীন যাচাইয়ের ওপর। গণতন্ত্রের স্বার্থেই তাই প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশন যেন প্রতিটি অভিযোগের জবাব তথ্য দিয়ে দেয় এবং প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
কেন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি?
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা।ককরোচ জনতা পার্টি ও বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার দায় এড়াতে পারেন না প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তাঁদের মতে, নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে শুধু আইন মেনে চললেই হবে না; নাগরিকদের কাছেও তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা স্পষ্ট হতে হবে। বিরোধীদের অভিযোগ আরও গভীর। তাঁদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হলে তা নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সমতা নষ্ট করতে পারে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি অবশ্য নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক কারসাজির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির বক্তব্য, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা, সরকারের নীতি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মতো কারণ রয়েছে। এই বিরোধের নিষ্পত্তি রাজনৈতিক বক্তব্যের লড়াই দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন কতটি নাম কেন বাদ পড়েছে, কতজন আপিল করে নাম ফেরত পেয়েছেন, কতটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর। তবে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হলে সেটিকে নিছক রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বলে উড়িয়ে দেওয়াও যথেষ্ট নয়। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
দিল্লিতে অবরুদ্ধ রাজপথ: আটক প্রায় দুই হাজার
১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা আন্দোলনটির রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর অবস্থানও সামনে নিয়ে এসেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ঘটনাপ্রবাহভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে কড়াকড়ি শুরু হয়। প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের কথা জানানো হয়। আগের রাত থেকে কয়েকটি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর বিধিনিষেধ ছিল। ট্রেন চলাচলেও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুরের পর দিল্লিজুড়ে আটক মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে পৌঁছায়। তাঁদের অনেককে যন্তর মন্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই আটক করে বাসে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সংগঠনটির নেতা সৌরভ দাস ও মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কাকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আটক হন সংগঠনটির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও। কেরলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাস ও সাবেক অর্থমন্ত্রী কে এন বালাগোপালকেও আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান। তাঁর দলের পক্ষ থেকে তাঁকে আটক করার কথা জানানো হয়। পরে আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও যন্তর মন্তরের কাছে আটক করা হয় বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে।
এদিকে বিজেপির নেতারা আন্দোলনটিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বিরোধী নেতারা আটক ও বিধিনিষেধকে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেন। কয়েকজন বিরোধী নেতা পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের জরুরি অবস্থার সময়ের তুলনাও করেছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, কোনো সমাবেশের অনুমতি না থাকলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক এবং নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল,তা বিচার করতে হবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও আইনি ভিত্তির আলোকে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাতে প্রতিবাদের সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশের গণতান্ত্রিক সুযোগ কোথায় থাকবে?
প্রতিবাদের পেছনে কি আরও বড় রাজনৈতিক অস্থিরতা?
ককরোচ আন্দোলনের উত্থান এমন এক সময়ে, যখন ভারতের রাজনীতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ২০২৭ সালে ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্যও রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্ক কেবল প্রশাসনিক বিষয় হয়ে নেই; এটি ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলো চাইছে, ভোটার তালিকা নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করতে। তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই ঐক্য কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। বিভিন্ন বিরোধী দলের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশল রয়েছে; একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত হওয়া মানেই সব বিষয়ে স্থায়ী ঐক্য তৈরি হওয়া নয়।
অন্যদিকে তরুণদের অংশগ্রহণের তাৎপর্যও কম নয়। অনলাইন ব্যঙ্গ, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং দ্রুত সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা এখন রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচিত উপাদান। তবে ডিজিটাল জনপ্রিয়তা আর দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তি এক জিনিস নয়। কোনো আন্দোলন সত্যিকার অর্থে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নির্ভর করে তার দাবির স্পষ্টতা, জনসমর্থন, সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। ককরোচ আন্দোলনও সেই পরীক্ষার মুখে। তারা কি কেবল একটি আলোচিত প্রতিবাদের নাম হয়ে থাকবে, নাকি নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারবে—সেটি নির্ধারণ করবে আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহ।
কোন পথে ভারত?
ভারতের সামনে এখন প্রশ্নটি শুধু একটি তরুণ সংগঠনের আন্দোলন দমন বা একটি রাজনৈতিক সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে অটুট থাকবে? ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নাগরিকের সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব কে নেবে? আর ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার ও জনশৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে? ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন তথ্য ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। বিরোধীদের অভিযোগ সত্য হলে তার তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর অভিযোগের কোনো অংশ ভুল হলে নির্বাচন কমিশনেরও উচিত স্পষ্ট তথ্য দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা। গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়; একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও জরুরি।
দিল্লির রাজপথে ব্যাপক আটক, তরুণদের ক্ষোভ এবং বিরোধী নেতাদের প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামনে একটি কঠিন পরীক্ষা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র কি সমালোচনাকে হুমকি হিসেবে দেখবে, নাকি সেই সমালোচনার মধ্য দিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে? দমন-পীড়ন দিয়ে সাময়িকভাবে রাজপথ নীরব করা যেতে পারে। কিন্তু মানুষের মনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করা যায় না কেবল ব্যারিকেড দিয়ে। আবার রাজনৈতিক অভিযোগের উত্তাপও সত্য-মিথ্যার নিরপেক্ষ যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না।
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য, নাগরিকেরা কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের কথা বলতে পারেন এবং ভোটাররা কতটা নিশ্চিন্তে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন,তার ওপর।
১০ অক্টোবরের দিল্লি তাই কেবল একটি বিক্ষোভের দিন নয়; এটি এক বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্ত। কোন পথে ভারত,আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দিকে, নাকি আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক আস্থার দিকে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ক্ষমতাসীনদের হাতে নয়; নির্বাচন কমিশন, বিরোধী দল, আদালত, নাগরিকসমাজ এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের সাধারণ ভোটারদের ভূমিকাও তা নির্ধারণ করবে।##

