কাজী মনসুর#
একদিকে সৌদি আরবের ঝলমলে নগরী, তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতি ও আধুনিক অবকাঠামো; অন্যদিকে তারই প্রতিবেশী ইয়েমেন—যেখানে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, কোটি মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, আর নতুন করে বিস্তৃত হচ্ছে যুদ্ধের আগুন। কেন একই ভূখণ্ডের কাছাকাছি থাকা দুটি দেশের ভাগ্য এত আলাদা? ইয়েমেনের সংকট কি নিছক গৃহযুদ্ধ, নাকি এর আড়ালে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াই, ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ?
পাশাপাশি দুই দেশ, অথচ দুই বিপরীত বাস্তবতা
আরব উপদ্বীপের মানচিত্রে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের অবস্থান পাশাপাশি। উত্তরে ও পূর্বে সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, আর তার দক্ষিণ সীমান্ত ঘেঁষে ইয়েমেন। দুই দেশের মধ্যে শুধু সীমান্তের সম্পর্ক নয়, রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, গোত্রীয় যোগাযোগ, বাণিজ্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। অথচ অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিচারে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল ব্যবধান।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ আজ আঞ্চলিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আধুনিক নগরায়ণের অন্যতম কেন্দ্র। তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত বিপুল আয় দেশটির অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করেছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনোদন ও অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের বহু অঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন আবর্তিত হচ্ছে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক প্রয়োজনকে ঘিরে। দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘ সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল, অবকাঠামোর বড় অংশ বিপর্যস্ত এবং বহু মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সৌদি আরবের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ছিল প্রায় ৩৫ হাজার ১২২ ডলার। ইয়েমেনের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ৬৩৪ ডলার। অর্থাৎ এই সূচকে ব্যবধান প্রায় ৫৫ গুণ। মাথাপিছু জিডিপি ব্যক্তিগত আয়ের সরাসরি পরিমাপ নয়, কিন্তু দুটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ব্যবধানটি বুঝতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। কিন্তু এই ব্যবধানের ব্যাখ্যা কি শুধু তেলসম্পদে সীমাবদ্ধ? নাকি ইয়েমেনের ইতিহাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা দেশটিকে এমন এক সংকটে ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইয়েমেনের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে।
একীভূত দেশ, বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইয়েমেনের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিনের বিভাজন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে চিহ্নিত। ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হয়ে একটি রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু একীভূত হওয়া মানেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ মুছে যাওয়া নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, ক্ষমতার বণ্টন, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে বিরোধ থেকেই যায়। দীর্ঘদিন দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন আলি আবদুল্লাহ সালেহ। ২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ ইয়েমেনেও আছড়ে পড়ে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন এবং তাঁর উপপ্রধান আবদরাব্বু মনসুর হাদি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল ইয়েমেনের সংকটের সমাধান করতে পারেনি। নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে মতবিরোধ চলতে থাকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ে। এই অস্থিরতার মধ্যেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে হুতি আন্দোলন, যার আরবি নাম আনসার আল্লাহ। উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক এই আন্দোলনের শিকড় রয়েছে দেশটির জাইদি শিয়া ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যে। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত চলেছে। পরে তারা জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণে নেয়। রাজনৈতিক রূপান্তর কার্যত ভেঙে পড়ে। ২০১৫ সালের মার্চে হাদি সরকারের অনুরোধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। এভাবেই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক সংঘাতের রূপ নেয়। জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূতের কার্যালয়
হুতিরা কারা, আর কেন তাদের ঘিরে এত সংঘাত?
ইয়েমেনের যুদ্ধ বুঝতে হলে হুতিদের উত্থান ও তাদের রাজনৈতিক-সামরিক ভূমিকা বুঝতে হবে। তবে হুতিদের কেবল ইরানের তৈরি একটি বাহিনী হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। হুতি আন্দোলনের নিজস্ব ইয়েমেনি শিকড়, স্থানীয় সমর্থনের ভিত্তি, ধর্মীয় পরিচয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে ইরানের কাছ থেকে তাদের সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা বেড়েছে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। হুতিরা রাজধানী সানা এবং উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারও দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সব অঞ্চলে কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। এই পরিস্থিতি যুদ্ধকে আরও জটিল করেছে। কারণ এখানে সংঘাত কেবল দুটি পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হুতি বাহিনী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, বিভিন্ন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং তাদের পেছনে থাকা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ সব সময় এক নয়।
সৌদি আরব চায় তার দক্ষিণ সীমান্তে এমন একটি নিরাপত্তাব্যবস্থা, যেখানে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি কমবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব সীমিত থাকবে। ইরান হুতিদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। তবে এই সম্পর্কের প্রকৃতি ও মাত্রা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে; হুতিদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধকে শুধু সৌদি আরব বনাম ইরান হিসেবে ব্যাখ্যা করলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হারিয়ে যায়।
সৌদি আরবের জন্য ইয়েমেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সীমান্ত থাকলেই নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি হয়। কিন্তু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর। ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ইয়েমেনের ভূখণ্ডে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের উপস্থিতি সৌদি আরবের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্ন তৈরি করে। অতীতে হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও স্থিতিশীল, ঐক্যবদ্ধ এবং কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কি ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব? সামরিক অভিযান কোনো প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমাতে পারে, কিছু অঞ্চল পুনর্দখল করতে পারে কিংবা সাময়িকভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। কিন্তু যে দেশে রাজনৈতিক বৈধতা, ক্ষমতা ভাগাভাগি, আঞ্চলিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন অমীমাংসিত, সেখানে শুধু সামরিক বিজয় দীর্ঘমেয়াদি শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না।
লোহিত সাগর: ইয়েমেনের সংকট যখন বিশ্ববাণিজ্যের উদ্বেগ
ইয়েমেনের গুরুত্ব শুধু তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য নয়। দেশটির পশ্চিম উপকূল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির অবস্থান তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করে ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারের মধ্যে। সুয়েজ খালমুখী সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্যও প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জলপথে অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব ইয়েমেনের সীমান্তে আটকে থাকে না। জাহাজকে বিকল্প পথে ঘুরে যেতে হলে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। বীমার খরচ বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থায় বিলম্ব হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে। তারা এসব হামলাকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তবে হামলার পরিধি, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ সামরিক পদক্ষেপও নেয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। ইয়েমেন নিজেই দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য ও যুদ্ধের ক্ষত বহন করছে, অথচ তার উপকূলের একটি কৌশলগত জলপথকে কেন্দ্র করে বিশ্বশক্তিগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে।২০২৬ সালের অক্টোবরের পরিস্থিতি এই গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির ৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বছরের মাঝামাঝি থেকে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা আবারও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান তার জন্য একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও বিপদের উৎস। সমুদ্রবাণিজ্যের কেন্দ্রের কাছে অবস্থান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ সংঘাত সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর আবার কেন যুদ্ধের আগুন?
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনে সহিংসতা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল। যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হলেও বহু ফ্রন্টে লড়াইয়ের তীব্রতা কমে যায়। কিন্তু যুদ্ধবিরতি রাজনৈতিক সমাধানে রূপ নিতে পারেনি। ২০২৬ সালের মধ্যে পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের উত্থান-পতন এবং সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় মিত্রদের সমর্থন ইয়েমেনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হুতি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নতুন সংঘাত। অক্টোবরের শুরুতে ইয়েমেনি সরকার হুতিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল পুনর্দখলের সামরিক অভিযান শুরুর কথা জানায়। পাল্টা সংঘাতে কৌশলগত উপকূলীয় অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ নিয়ে লড়াই তীব্র হয়।
১০ অক্টোবর আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশটি কার্যত আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে ফিরে গেছে। একই প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, আগস্টের পর থেকে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন; সেপ্টেম্বর থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে। এই তথ্যগুলো ২০২৬ সালের অক্টোবরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় হতাহত ও নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের সংখ্যা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।
প্রশ্ন হলো, এত বছর যুদ্ধের পর আবার পূর্ণমাত্রার সংঘাতের ঝুঁকি কেন তৈরি হলো? কারণ যুদ্ধবিরতি সহিংসতা থামাতে পারে, কিন্তু বিরোধের রাজনৈতিক কারণগুলো দূর না হলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
ধ্বংসস্তূপের আড়ালে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় মানুষের
ভূরাজনীতি, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সমুদ্রপথ এবং সামরিক জোট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাটি প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়. সাধারণ মানুষের জীবন।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক সংস্থা ওসিএইচএ ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত ইয়েমেন মানবিক চাহিদা ও সহায়তা পরিকল্পনায় জানিয়েছে, ওই বছর দেশটিতে দুই কোটির বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন হবে। তাদের মধ্যে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর মাত্র ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ সম্পূর্ণ কার্যকর ছিল। পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সহায়তার প্রয়োজনও ব্যাপক। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের ভেঙে পড়া জীবন। কোনো বাবা হয়তো কাজ হারিয়েছেন, কোনো মা সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারছেন না, কোনো শিশু বছরের পর বছর নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিতে হচ্ছে, অথচ সেখানেও নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। মানবিক বিপর্যয়কে কেবল খাদ্য বা অর্থের ঘাটতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘ সংঘাত মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার ক্ষমতাও কেড়ে নেয়। শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হয়, জীবিকা হারিয়ে যায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠে। যে অর্থ যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় হয়, তার বিপরীতে শিক্ষা, চিকিৎসা, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করা গেলে একটি দেশের ভবিষ্যৎ অন্য পথে যেতে পারত। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প স্থাপন করাই কঠিন; আর যে প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন পরিচালনা করবে, সেগুলোই যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে পুনর্গঠন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সৌদি আরব সমৃদ্ধ হলো, ইয়েমেন পিছিয়ে পড়ল—এখানে কি শুধু তেলের ভূমিকা?
দুটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবধানের পেছনে তেলসম্পদের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের বিশাল তেলসম্পদ তাকে রাষ্ট্রীয় আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বড় অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ দিয়েছে। ইয়েমেনেও তেল ও গ্যাসের সম্পদ রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর পরিমাণ, উৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনীতিতে অবদানের পরিসর সৌদি আরবের সমতুল্য নয়। তবে শুধু সম্পদের পরিমাণ দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা যায় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর, রাজস্ব কীভাবে ব্যবহৃত হয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা বজায় থাকে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কতটা বিনিয়োগ হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ কেমন, এসব বিষয়ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের ক্ষেত্রে সংঘাত এই সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির প্রকৃত মাথাপিছু জিডিপি ৫৪ শতাংশ কমে যায়। তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়া, সরকারি রাজস্ব কমে যাওয়া, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে। অর্থাৎ ইয়েমেন শুধু তুলনামূলকভাবে কম সম্পদ নিয়ে যাত্রা করেনি; যুদ্ধের কারণে বিদ্যমান সম্পদ ও উৎপাদনক্ষমতারও বড় অংশ হারিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ইয়েমেন অর্থনীতি মূল্যায়ন
এখানে একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে: প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো দেশকে উন্নয়নের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। একইভাবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা কোনো দেশের উন্নয়নের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয় না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ নিয়েও উন্নয়ন সম্ভব। ইয়েমেনের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা বারবার যুদ্ধের ধাক্কায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?
ইয়েমেনের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। সামরিক শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলাতে পারে, আঞ্চলিক উত্তেজনা নতুন সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং কোনো পক্ষের সামরিক সাফল্যও রাজনৈতিক সমাধানের পথ কঠিন করে তুলতে পারে। তবু কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, ইয়েমেনের সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আসার সম্ভাবনা সীমিত। দ্বিতীয়ত, হুতিদের ভূমিকা, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কার্যকারিতা, দক্ষিণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং বিভিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠীর স্বার্থ নিয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষের ভূমিকা সংঘাত কমানো কিংবা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনিদের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এমন একটি প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যেখানে যুদ্ধের পক্ষগুলো কেবল নিজেদের সামরিক অবস্থান নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো, ক্ষমতার বণ্টন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জনগণের অধিকার নিয়েও সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।
একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা, বন্দিবিনিময়, বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরাপদ চলাচলের প্রশ্নেও বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি। কারণ রাজনৈতিক সমঝোতা হতে সময় লাগলেও মানুষের খাবার, পানি, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার প্রয়োজন অপেক্ষা করে না।
কিন্তু শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবিশ্বাস। বহু বছর ধরে সংঘাতে জড়িয়ে থাকা পক্ষগুলো একে অন্যের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। কেউ নিরাপত্তা চায়, কেউ ক্ষমতার স্বীকৃতি, কেউ আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে চায়, আবার কেউ বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। এসব স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা তৈরি না হলে যুদ্ধবিরতি সাময়িক বিরতিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ কি আবার গড়ে উঠতে পারে?
ইয়েমেনের ইতিহাস শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়। দেশটির রয়েছে প্রাচীন সভ্যতা, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, কৃষি ও বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হলে এসব সম্পদ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হতে পারে। তবে পুনর্গঠন মানে শুধু ধ্বংস হওয়া ভবন আবার তৈরি করা নয়। প্রয়োজন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার, কার্যকর প্রশাসন এবং এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবধান কমানোও এক দিনে সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন প্রয়োজন। আর এসবের প্রথম শর্ত হলো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে যুদ্ধের আশঙ্কা প্রতিদিন মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে না। ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু ইয়েমেনিদের হাতে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা। কিন্তু এই বৃহত্তর স্বার্থের আলোচনায় ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে যেন আবারও উপেক্ষা করা না হয়। কারণ একটি দেশের প্রকৃত পুনরুত্থান তার রাজধানীর ভবন, সামরিক শক্তি কিংবা সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে একা মাপা যায় না। মাপতে হয় মানুষ কতটা নিরাপদে বাঁচতে পারছে, শিশু কতটা নিশ্চিন্তে স্কুলে যেতে পারছে এবং একটি পরিবার আগামীকাল নিয়ে কতটা স্বপ্ন দেখতে পারছে, তা দিয়ে।
ইয়েমেনের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কে কতখানি ভূখণ্ড দখল করল, শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, কত মানুষের জীবন আর ধ্বংস হবে, কত প্রজন্ম যুদ্ধের মূল্য দেবে এবং কবে দেশটি তার মানুষের জন্য একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে আনতে পারবে? ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন করে রাষ্ট্র গড়া সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন যুদ্ধের হিসাবের বাইরে গিয়ে মানুষের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইয়েমেনের যুদ্ধের শেষ কোথায়, সেই উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে শুধু রণক্ষেত্রে নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক সংযম এবং ইয়েমেনের মানুষের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনার বাস্তব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে।#

