-- বিজ্ঞাপন ---

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এআই রোবটের রাজত্ব: কেন বিশ্বকে অবাক করছে চীন?

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (Industry 4.0) বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), রোবটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), বিগ ডেটা এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি উন্নত শিল্পোন্নত দেশ এখন উৎপাদন খাতে মানুষের পাশাপাশি এআই-চালিত রোবট ব্যবহার করছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে চীন।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিক্স (IFR)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী যত নতুন শিল্প রোবট স্থাপন করা হয়েছিল, তার প্রায় অর্ধেকই ছিল চীনে। সে বছর দেশটি প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজারেরও বেশি নতুন শিল্প রোবট স্থাপন করে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালেও করোনা মহামারির মধ্যেই চীন প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার নতুন রোবট শিল্প কারখানায় যুক্ত করেছিল।

একই সময়ে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানি শিল্প রোবট ব্যবহারে যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে ছিল। অন্যদিকে ভারত, মেক্সিকো, তাইওয়ান, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডও ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যদিও চীনের তুলনায় তাদের বিনিয়োগ এখনও অনেক কম।

কিন্তু শুধু রোবটের সংখ্যা দিয়েই চীনের সাফল্য ব্যাখ্যা করা যায় না। দেশটির আসল শক্তি হলো—রোবট, এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট ডেটা অ্যানালিটিক্সকে একই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। ফলে একটি আধুনিক কারখানায় হাজার হাজার সেন্সর, শত শত রোবট এবং এআই সফটওয়্যার একসঙ্গে কাজ করে উৎপাদনের গতি, মান এবং দক্ষতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর অন্যতম উদাহরণ চীনের লিয়াওনিং প্রদেশে নির্মিত আধুনিক এআই-নির্ভর রেফ্রিজারেটর উৎপাদন কারখানা। অত্যাধুনিক রোবোটিক অ্যাসেম্বলি লাইন, স্বয়ংক্রিয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পরিচালিত এই কারখানায় বিভিন্ন মডেলের কোটি কোটি রেফ্রিজারেটর উৎপাদিত হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন দক্ষতার কারণে এই কারখানাটি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের Global Lighthouse Network-এর স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্মার্ট কারখানাগুলোর অন্যতম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

চীনের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। “Made in China 2025”, “Industrial Internet”, “AI Development Plan” এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও রোবট শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ দেশটির শিল্প খাতকে দ্রুত আধুনিক করেছে। ফলে কম খরচে, দ্রুত এবং উচ্চমানের উৎপাদনের মাধ্যমে চীন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

তবে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের একটি বড় সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, আগামী এক দশকে উৎপাদন, গুদাম ব্যবস্থাপনা, পরিবহন এবং সাধারণ অ্যাসেম্বলি লাইনের কোটি কোটি কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যেতে পারে। অনেক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ রোবট সম্পন্ন করবে, ফলে কম দক্ষ শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে আবার রোবট রক্ষণাবেক্ষণ, এআই সফটওয়্যার, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় কারখানা পরিচালনার মতো নতুন ধরনের লাখ লাখ উচ্চ দক্ষতার চাকরিও সৃষ্টি হবে।

আগামী দশকে কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের উৎপাদন শিল্প আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে।

সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো হতে পারে—

অধিকাংশ নতুন কারখানা হবে “Lights-Out Factory”, যেখানে মানুষের উপস্থিতি খুবই সীমিত থাকবে।
এআই নিজেই উৎপাদন পরিকল্পনা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রপাতির ত্রুটি শনাক্ত করতে পারবে।
হিউম্যানয়েড (মানবসদৃশ) রোবট ধীরে ধীরে কারখানার সাধারণ শ্রমিকদের কিছু কাজও সম্পাদন করবে।
উৎপাদন ব্যয় কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে।
যে দেশগুলো এআই, রোবটিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেবে, তারাই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করবে।
চীন কি বিশ্বের শিল্প শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের শিল্প মানচিত্রকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।

তবুও একটি বিষয় এখন প্রায় নিশ্চিত—ভবিষ্যতের শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে সেই দেশ, যার হাতে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত রোবটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা। আর সেই প্রতিযোগিতায় চীন ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।##