কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
ভারতের প্রতিরক্ষা ও বিমান শিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির মাটিতে সংযোজিত (Assembled) প্রথম Airbus C-295 মিডিয়াম-ওয়েট সামরিক পরিবহন বিমান সফলভাবে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে। গুজরাটের ভাদোদারায় অবস্থিত Tata Advanced Systems Limited (TASL)-এর উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিমানটি উড্ডয়ন করে নির্ধারিত ফ্লাইট প্রোফাইল অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে নিরাপদে অবতরণ করে।
এই ঘটনাকে শুধু একটি টেস্ট ফ্লাইট নয়, বরং ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এটিই প্রথম সামরিক পরিবহন বিমান, যা একটি বেসরকারি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দেশটির মাটিতে সংযোজন করা হয়েছে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র অন্যতম বড় সাফল্য
ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi ঘোষিত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা Airbus এবং Tata Advanced Systems Limited-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২১ সালে এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেসের সঙ্গে প্রায় ২১ হাজার ৯৩৫ কোটি রুপি মূল্যের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য মোট ৫৬টি C-295 পরিবহন বিমান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ১৬টি বিমান স্পেনে উৎপাদন করে ভারতকে সরবরাহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বিমান ভারতীয় বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে। বাকি ৪০টি বিমান ভারতের গুজরাটের ভাদোদারায় স্থাপিত অত্যাধুনিক টাটা-এয়ারবাস উৎপাদন কেন্দ্রে সংযোজন ও উৎপাদন করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে সবগুলো বিমান পর্যায়ক্রমে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার দিকে জোর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, C-295 প্রকল্প শুধু একটি বিমান ক্রয় কর্মসূচি নয়; এটি মূলত প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ বিমান উৎপাদন শিল্পের ভিত্তি নির্মাণের একটি বৃহৎ উদ্যোগ।
এই প্রকল্পে শতাধিক ভারতীয় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, কেবলিং, ইলেকট্রনিক উপাদান, স্ট্রাকচারাল কম্পোনেন্ট এবং সাব-সিস্টেম সরবরাহ করছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
পুরোনো Avro বহরের পরিবর্তে আসছে C-295
ভারতীয় বিমান বাহিনী কয়েক দশক ধরে ব্রিটিশ-উৎপাদিত HS-748 Avro পরিবহন বিমান ব্যবহার করে আসছে। অনেক বিমানই এখন প্রযুক্তিগতভাবে পুরোনো হয়ে গেছে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এসব পুরোনো বিমানের পরিবর্তে ধাপে ধাপে আধুনিক C-295 যুক্ত করা হচ্ছে। নতুন বিমানগুলো পরিবহন সক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি দক্ষতা এবং অপারেশনাল নমনীয়তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি এনে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কী কী করতে পারবে এই বিমান?
Airbus C-295 একটি আধুনিক মিডিয়াম-ওয়েট ট্যাকটিক্যাল মিলিটারি ট্রান্সপোর্ট বিমান।
এটি একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৭১ জন সশস্ত্র সৈন্য অথবা ৪৮ থেকে ৫০ জন প্যারাট্রুপার বহন করতে পারে। এছাড়া প্রায় ৯ হাজার ২৫০ কেজি পর্যন্ত সামরিক সরঞ্জাম ও মালামাল পরিবহন করতে সক্ষম।
বিমানটি বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও বেসামরিক মিশনে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে- সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন,প্যারাট্রুপার মোতায়েন, এয়ারড্রপ অপারেশন, মানবিক সহায়তা মিশন,দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রম,মেডিকেল ইভাকুয়েশন (MEDEVAC),সীমান্ত এলাকায় লজিস্টিক সহায়তা,দুর্গম এলাকাতেও অপারেশনের সক্ষমতা । C-295-এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর Short Take-Off and Landing (STOL) সক্ষমতা।
ফলে বিমানটি ছোট, অপ্রস্তুত কিংবা অপেক্ষাকৃত বন্ধুর রানওয়ে থেকেও নিরাপদে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। ভারতের হিমালয় অঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম এলাকা কিংবা সীমান্তবর্তী সামরিক ঘাঁটিগুলোতে দ্রুত রসদ ও সেনা পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ
বিমানটিতে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে দুটি Pratt & Whitney Canada PW127G টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন। প্রতিটি ইঞ্জিন প্রায় ২ হাজার ৬৪৫ হর্সপাওয়ার শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম। এছাড়া এতে রয়েছে— Honeywell RDR-1400C আবহাওয়া রাডার,আধুনিক ডিজিটাল ককপিট,উন্নত অ্যাভিওনিক্স ব্যবস্থা,গ্লাস ককপিট প্রযুক্তি,অত্যাধুনিক নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
দুইজন পাইলট পরিচালিত এই বিমানের ক্রুজিং গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪৮২ কিলোমিটার এবং সার্ভিস সিলিং প্রায় ২৫ হাজার ফুট। পূর্ণ জ্বালানি ধারণের মাধ্যমে এর ফেরি রেঞ্জ প্রায় ৫ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার।
ভবিষ্যতের জন্য বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, C-295 প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি ভারতকে শুধু বিমান ক্রেতা নয়, বরং বিমান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে নিচ্ছে। প্রতিরক্ষা খাতের বাইরে ভবিষ্যতে বেসামরিক বিমান উৎপাদন, রপ্তানি বাজারে প্রবেশ এবং আরও জটিল সামরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। ভারতের মাটিতে সংযোজিত প্রথম C-295-এর সফল উড্ডয়ন তাই কেবল একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট নয়; এটি দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা এবং বিমান উৎপাদন সক্ষমতার নতুন যাত্রার প্রতীক।##

