-- বিজ্ঞাপন ---

পরমাণু যুদ্ধের কাউন্টডাউন? বিশ্বকে সতর্ক করল SIPRI

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর ইয়ারবুক ২০২৬ অনুযায়ী, পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

SIPRI-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে আনুমানিক ১২ হাজার ১৮৭টি পারমাণবিক অস্ত্র মজুত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। রাশিয়ার কাছে বর্তমানে ৫ হাজার ৪২০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫ হাজার ৪২টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ১ হাজার ৭৯৬টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৭৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র বর্তমানে মোতায়েনকৃত অবস্থায় রয়েছে। বাকি অস্ত্রগুলো সামরিক মজুত হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে SIPRI। সংস্থাটির দাবি, ভারত প্রথমবারের মতো তার কিছু পারমাণবিক অস্ত্র কার্যকরভাবে মোতায়েন করেছে। ভারতের মোট আনুমানিক ১৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেডের মধ্যে প্রায় ১২টি বর্তমানে মোতায়েন অবস্থায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১৭০টি হলেও কোনো অস্ত্র মোতায়েনকৃত অবস্থায় দেখানো হয়নি।

চীনের পারমাণবিক সক্ষমতাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে SIPRI। বর্তমানে দেশটির কাছে আনুমানিক ৬২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩৪টি মোতায়েন অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করে না।

ইউরোপের দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যুক্তরাজ্যের কাছে ২২৫টি এবং ফ্রান্সের কাছে ৩৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে যথাক্রমে ১২০টি ও ২৮০টি অস্ত্র কৌশলগত সাবমেরিনে মোতায়েন রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক ৯০টি এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে প্রায় ৬০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তবে এই দুই দেশ তাদের অস্ত্র মোতায়েন সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। রাশিয়া সম্প্রতি তাদের আরএস-২৮ ‘সারমাত’ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে এবং আধুনিকায়ন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

SIPRI-এর হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৪ হাজার ১২টি পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার অস্ত্র সামরিক মজুত হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে, যা প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করা সম্ভব।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ তাদের প্রকৃত অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে SIPRI-এর তথ্যগুলো বিভিন্ন গবেষণা, উপগ্রহ চিত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং উন্মুক্ত সূত্রের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই বাড়ছে পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা। তাই বিশ্বশান্তি ও মানবতার স্বার্থে যুদ্ধ ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।##