কাজী আবুল মনসুর/সিরাজুর রহমান#
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের F-16 যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়ন ও সহায়তা প্যাকেজে ~$686 মিলিয়ন (প্রায় ৬৮৬ মিলিয়ন ডলার) অনুমোদন দিয়েছে। এই প্যাকেজে উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণ, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং সিকিউর কমিউনিকেশন/নেভিগেশন সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত থাকছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে প্যাকিস্তানের F-16 ফ্লিটকে অধুনিক মানে আপগ্রেড করে এবং প্রায় ২০৪০ পর্যন্ত কার্যক্ষম রাখা। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতাকে শক্তিশালী করছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে। প্যাকেটের অনুমোদনটি Congressional notification (যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নোটিফিকেশন) আকারে এসেছে এবং এখন তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আছে। ভারতের তরফে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, কারণ এটি দক্ষিণ এশিয়ার অস্ত্র ব্যালেন্সে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানের পক্ষে বলা হচ্ছে এটি তাদের সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা উন্নত করতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে F-16 পরিচালনার নিরাপত্তা ও ইন্টারঅপারেবিলিটি বাড়াবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ৬৮৬ মিলিয়ন ডলারের একটি ফরেইন মিলিটারি সেলস (FMS) প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এই প্যাকেজের আওতায় পাকিস্তানের বিদ্যমান এফ-১৬ ব্লক-৫২ মডেল ও পূর্ববর্তী সিরিজের বিমানগুলোতে Mid-Life Upgrade (MLU) কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
এই আপগ্রেডিং কার্যক্রম সম্পন্ন করবে আমেরিকার ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লখিড মার্টিন কর্পোরেশন। এই মিড লাইফ আপগেডিং শেষে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পুরোনো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এই প্যাকেজের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ৯২টি Link-16 ডাটা লিংক সিস্টেম সরবরাহ করা হবে।
লিংক-১৬ হলো ন্যাটো মানের একটি নিরাপদ, জ্যামিং-প্রতিরোধী ট্যাকটিক্যাল ডাটা লিংক, যা রিয়েল-টাইমে বিমান, স্থল ও নৌ-ইউনিটগুলোর মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিনিময় করতে সক্ষম। আধুনিক এয়ার কমব্যাটে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই প্রযুক্তি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আসলে ১৯৭৮ সালে সার্ভিসে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমান বিগত চার দশক ব্যাপী বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সফল সিঙ্গেল-ইঞ্জিন মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। বর্তমানে এর সর্বাধুনিক মডেল হলো এফ-১৬ভি (ভাইপার) ব্লক-৭০/৭২। আন্তর্জাতিক বাজারে এর আনুমানিক মূল্য হতে পারে প্রায় ১০০-১২৫ মিলিয়ন ডলার।
সিঙ্গেল ইঞ্জিনের এই যুদ্ধবিমানে আকাশে উড্ডয়ন এবং শক্তি উৎপাদনের জন্য একটি Pratt & Whitney F100-PW-229 বা GE F110-GE-129 আফটারবার্নিং টার্বোফ্যান ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। আকাশযুদ্ধে এর প্রধান অস্ত্র হিসেবে রয়েছে এআইএম-১২০সি-৭/৮ (AMRAAM), এ আইএম-৯ সাইডউইন্ডার, এজিএম-৮৮ (HARM) এবং এজিএম-৮৪ হারপুন মিসাইল সিস্টেম।
এর উন্নত ককপিটে মাল্টিফাংশনাল ডিসপ্লে এবং সুপারইমপোজড রাডার ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন সুবিধা ইনস্টল করা হয়েছে, যা কিনা যুদ্ধবিমানের পাইলটের পরিস্থিতি সচেতনতা (situational awareness) বৃদ্ধি করে। তাছাড়া ব্লক ৭০/৭২ ভ্যারিয়েন্টে যুক্ত হয়েছে উন্নত এভিওনিক্স, উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন এপিজি-৮৩ (AESA) রাডার, কনফর্মাল জ্বালানি ট্যাঙ্ক, আপডেটেড মিশন কম্পিউটার, নতুন সিকিউরিটি সিস্টেম।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশ বিভিন্ন সিরিজ ও ব্লকের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। মার্কিন বিমান বাহিনী এখনো পর্যন্ত প্রায় ৮৯৭টি এফ-১৬যুদ্ধবিমান অপারেট করে। এর বাইরে অন্যতম ব্যবহারকারী দেশের মধ্যে রয়েছে তুরস্ক (২৪৩), ইসরায়েল (২২৪), মিশর (২১৮), দক্ষিণ কোরিয়া (১৬৭), গ্রীস (১৫৪), তাইওয়ান (১৩৭), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৭৬), পাকিস্তান (৭৫), সিঙ্গাপুর (৬০), জর্ডান (৫৯), বেলজিয়াম (৫৩) ও থাইল্যান্ড (৫০)।
ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৭০–৬৮৫টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিভিন্ন দুর্ঘটনা বা যুদ্ধে ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিপুল ব্যবহার, প্রচুর অপারেশনাল মিশন এবং অসংখ্য রপ্তানি বিবেচনায় এই ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সীমিত আকারেই রয়েছে বলে মনে করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের ক্রয়াদেশ কিছুটা কমে এসেছে। তার প্রধান কারণ আমেরিকার নিজস্ব কৌশলগত ও রাজনৈতিক শর্ত, প্রযুক্তি হস্তান্তরে সীমাবদ্ধতা, ব্যয়বহুল এবং ব্যবহারকারীর কৌশলগত স্বাধীনতা সংক্রান্ত উদ্বেগকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে অনেক দেশ বর্তমানে এর বিকল্প হিসেবে চীনের জে-১০সিই, দক্ষিণ কোরিয়ার এফএ-৫০, কিংবা সুইডেনের Saab Gripen লাইট যুদ্ধবিমান বিবেচনা করছে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এর বহুমুখী সক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল রেকর্ডের কারণে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এখনো বিশ্বের অন্যতম কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানের স্থান দখল করে রেখেছে। তাই আমেরিকা পুরোনো যুদ্ধবিমানকে আরো উন্নত প্রযুক্তি, ইঞ্জীন, উন্নত রাডার এবং বিশেষ করে আধুনিক এভিয়নিক্স সিস্টেম দ্বারা সজ্জিত করে এফ-৩৫ এর পাশাপাশি আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত সার্ভিসে রাখতে চায়।#তথ্যসূত্র: Reuters, Lockheed Martin, USAF, Wikipedia

