-- বিজ্ঞাপন ---

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে ৬,০০০-এর বেশি এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার: মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাইলফলক

সিরাজুর রহমান#

মহাকাশ গবেষণায় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছে মানবসভ্যতা। আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে এখন পর্যন্ত ৬,০০০-এর বেশি এক্সোপ্ল্যানেট (সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত গ্রহ) আবিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। NASA ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, এসব এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার হয়েছে উন্নত টেলিস্কোপ ও ডেটা বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে। বিশেষ করে Kepler Space Telescope, TESS এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিভিন্ন মিশন এই আবিষ্কারে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিজ্ঞানীরা জানান, এই গ্রহগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশাল গ্যাসীয় দানব, আগুনে উত্তপ্ত গ্রহ, আবার কিছু গ্রহ আছে যেগুলো আকার ও গঠনে পৃথিবীর সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। এমনকি কয়েকটি গ্রহ তাদের নিজ নিজ নক্ষত্রের “হ্যাবিটেবল জোনে” অবস্থান করছে—যেখানে তরল পানির অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিপুল সংখ্যক এক্সোপ্ল্যানেটের আবিষ্কার মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার দরজা খুলে দিয়েছে। আগামী দিনে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংখ্যাটি আরও দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মহাকাশ বিজ্ঞানীদের ভাষায়, “৬,০০০ এক্সোপ্ল্যানেট কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের মহাবিশ্বকে বোঝার পথে এক বিশাল অগ্রগতি।” ১৯৯৫ সালে ৫১ পেগাসি বি আবিষ্কারের মাধ্যমে আমাদের সোলার সিস্টেমের বাহিরে এক্সোপ্ল্যানেট বা বহিঃ সৌর জাগতিক গ্রহের অস্তিত্ব সন্ধানের যাত্রা শুরু হয়, যা সৌরজগতের বাইরে প্রথম সূর্য সদৃশ তারার চারপাশে আবিষ্কৃত গ্রহ। ৫১ পেগাসি বি প্ল্যানেটটি আমাদের সোলার সিস্তেম থেকে ৫০-৫১ আলোকবর্ষ দূরত্বে তার হোস্ট ৫১ পেগাসি নক্ষত্রকে মাত্র চারদিনে প্রদক্ষিণ করছে। সেই ১৯৯৫ সাল থেকে চলতি ২০২৫ সাল পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রায় ৬,০০০ এর অধিক এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার করেছেন। এটিকে নিশ্চিতভাবেই মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের একটি মাইলফলক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এক্সোপ্ল্যানেট এই তালিকায় যোগ হচ্ছে।

আসলে, নাসার Exoplanet Archive এবং আন্তর্জাতিক দূরবীক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আকাশগঙ্গা ছায়াপথ জুড়ে এখনো পর্যন্ত এই ছয় হাজারের অধিক এক্সোপ্ল্যানেট অবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের এই চিরচেনা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে আনুমানিক এক ট্রিলিয়নের অধিক এক্সোপ্ল্যানেট ছড়িয়ে থাকতে পারে। নাসার পাঠানো উচ্চ প্রযুক্তির কেপলার, টিইএসএস, হাবল এবং জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে লুকিয়ে থাকা অজানা ও রহস্যময় বহিঃ সৌর জাগতিক গ্রহের গঠন, আকার ও বৈশিষ্ট্য জানার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যদিও আমাদের সোলার সিস্টেমের সীমানা পেরিয়ে মানবজাতি এখনো পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী নক্ষত্রের কাছাকাছি পৌঁছানোর মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা আমাদের সোলার সিস্টেমের ৪.২৬ আলোকবর্ষ দূরত্বে থাকা, পার্শ্ববর্তী প্রক্সিমা সেন্টুরি সিস্টেমে অবস্থান করা প্রক্সিমা সেন্টুরি বি গ্রহটি গত ২০১৬ সালের দিকে আবিষ্কৃত হয়। যা এতদিন আমাদের কাছে অনেকটাই অজানা রয়ে গিয়েছিল। তবে আমাদের সোলার সিস্টেমের কুইপার বেল্ট এবং ওর্ট ক্লাউডে রহস্যময় গ্রহ সাদৃশ্য অজানা অবজেট লুকিয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

অন্যদিকে, গত ২০১৫ সালে ১২৪ আলোকবর্ষ দূরত্বে আবিষ্কৃত হয় কে-২-১৮ বি এক্সোপ্ল্যানেট। তবে ২০১৯ সালে এর বায়ুমণ্ডলে জলের বাষ্পের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় গ্রহের বায়ুমণ্ডল এবং জলের অস্তিত্ব রয়েছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। যদিও এ নিয়ে বাস্তবে প্রমাণযোগ্য কোনো ডেটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, আমাদের গ্যালাক্সিতে ট্রিলিয়নের অধিক গ্রহের মধ্যে এখনো পর্যন্ত অতি ক্ষুদ্র এক অংশে এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, কিছু গ্রহ এমনও আছে, যা এক সঙ্গে দুইটি তারার চারপাশে ঘোরে, যা প্রমাণ করে যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ এক্সোপ্ল্যানেট টিকে থাকতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেটের আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্বের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। কিছু গ্রহ অনেকটাই আমাদের পৃথিবীর মতো সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন সুপার আর্থ। আর অতি উন্নত প্রযুক্তির টেলিস্কোপের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন এই সৌর : বহি জাগতিক গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব কিংবা সম্ভাবনা রয়েছে কিনা, তা নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।##সূত্র : NASA Exoplanet Archive, ESA, Space.com & ScienceDaily.