সিরাজুর রহমান#
ডেইলি সাবাহ নিউজের দেয়া তথ্যমতে, তুরস্ক সম্প্রতি তার নিজস্ব প্রযুক্তির প্রথম টিএফ-২০০০ ডেস্ট্রয়ার ব্যাটল শিপ তৈরি শুরু করেছে। প্রায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ডেস্ট্রয়ারের ওজন হবে প্রায় ৮,৩০০ টন। মূলত অনেকটা স্টেলথ প্রযুক্তির এই যুদ্ধজাহাজে নিজস্ব এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ছাড়াও, উন্নত অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিকালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, মিসাইলের সঙ্গে হেভি ফায়ার পাওয়ার ইনস্টল করা হবে।
তুরস্ক পরিকল্পনা মাফিক এই জাতীয় মোট ৮টি ডেস্ট্রয়ার পর্যাক্রমে তৈরি করবে। কমব্যাট ও নন-কমব্যাট মিলিয়ে তুরস্কের নৌবাহিনীতে মোট প্রায় ১৮০-১৯০টি জাহাজ থাকলেও দেশটির হাতে বর্তমানে কোন হেভি ডেস্ট্রয়ার কিংবা পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন কিংবা হেভি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার নেই। যদিও দেশটি সম্প্রতি ২৭,৪৩৬ টন ওজনের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি (টিসিজি আনাদুলু) অ্যাম্ফিবিয়াস এ্যাসাল্ট শিপ বা লাইট ক্যারিয়ার সার্ভিসে এনেছে।
বর্তমানে সারা বিশ্বের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপান ও ভারতের পাশাপাশি মোট ১৪-১৫টি দেশ হেভি ও মিডিয়াম টাইপের ডেস্ট্রয়ার বা মিসাইল গাইডেড ব্যাটল শিপ অপারেট করে, যেগুলোকে আধুনিক নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে ‘সমুদ্রের শক্তির মূল স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দেশগুলো তাদের নৌবাহিনীতে নিজস্ব চাহিদা মাফিক বিভিন্ন টাইপের ডেস্ট্রয়ার ব্যাটল শিপ ব্যবহার করে।
এই জাতীয় যুদ্ধজাহাজে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রাডার, সেন্সর, হেভি মিসাইল সিস্টেম, নেভাল গান, এবং এর পাশাপাশি এয়ার ডিফেন্স মিসাইল দ্বারা সজ্জিত করা থাকে। তাছাড়া এর পাশাপাশি এন্টি সাবমেরিন ওয়ারফার হিসেবে হেভি টর্পেডো দ্বারা সজ্জিত করা থাকে।
তবে বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে রাশিয়া হয়ত নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি সমৃদ্ধ লিডার ক্লাস ডেস্ট্রয়ার বা গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার প্রজেক্ট নিজে কাজ শুরু করেছে। যার প্রস্তাবিত ওজন হবে প্রায় ১৯ হাজার টন। যদিও এটি সার্ভিসে আসার বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা থেকে গেছে।
এদিকে এককভাবে সর্বোচ্চ ডেস্ট্রয়ার টাইপের হেভি যুদ্ধজাহাজ ব্যবহারকারী দেশ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নৌবাহিনীতে বর্তমানে বিভিন্ন সিরিজের মোট ৮১টি গাইডেড/মিসাইল গাইডেড ডেস্ট্রয়ার বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধজাহাজ অপারেশনাল রয়েছে। দেশটির নৌবাহিনীতে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ হিসেবে মূলত আর্লেই বার্ক-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার ব্যবহার করা হয়।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার এর চলতি ২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্যমতে, আমেরিকার পাশাপাশি চীনের নৌবাহিনীতে মোট ৫০টি নিজস্ব প্রযুক্তির ডেস্ট্রয়ার রয়েছে। আবার অন্যান্য দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে জাপানের ৪২টি, রাশিয়ার ১০টি, দক্ষিণ কোরিয়া ১৩টি, ভারত ১৩টি, ফ্রান্স ১১টি করে ডেস্ট্রয়ার অপারেশনাল রয়েছে। তার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ৬টি, মেক্সিকো ৫টি, তাইওয়ান ৪টি, ইতালি ৩টি এবং আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী ৩টি করে বিভিন্ন সিরিজের হেভি ডেস্ট্রয়ার অপারেট করে।
তাছাড়া র্যয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভি ৩টি এবং পাকিস্তানের নৌবাহিনীর ২টি করে মিডিয়াম টাইপের মিসাইল গাইডেড ডেস্ট্রয়ার অপারেশনাল রয়েছে। তবে বর্তমানে নেভাল কমব্যাট শিপের দিক দিয়ে আমেরিকা ও চীনের নেভাল মিলিটারি পাওয়ার ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে তা কিন্তু বিশ্বের সামনে ফুটে উঠেছে। তবে এখানে উল্লেখিত সকল দেশের জাহাজ ও সংখ্যাগুলো বিভিন্ন উন্মুক্ত উৎসের ভিত্তিতে আনুমানিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রদর্শন করা হয়েছে।
চীনের নৌবাহিনীতে বর্তমানে প্রায় ৫০টি ডেস্ট্রয়ার বা মিসাইল গাইডেড যুদ্ধজাহাজ সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে ৮টি টাইপ ০৫৫ এবং ২৫টি বা তার অধিক টাইপ ০৫২ডি ক্লাসের হেভি মিসাইল গাইডেড হেভি ডেস্ট্রয়ার-কে সবচেয়ে আধুনিক এবং শক্তিশালী করে ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে।
চীনের তুলনায় সংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের হেভি ডেস্ট্রয়ার বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধজাহাজ কম হলেও ভারত সাম্প্রতিক সময়ে তার নিজস্ব প্রযুক্তির অত্যাধুনিক ৪টি ‘বিশাখাপত্তনম’ ক্লাস মিসাইল গাইডেড হেভি ডেস্ট্রয়ার পর্যায়ক্রমে সার্ভিসে এনেছে। বিশেষ করে ভারতের নৌবাহিনীতে বর্তমানে অপারেশনাল থাকা মোট ডেস্ট্রয়ারের সংখ্যা হচ্ছে মোট ১৩টি।
বর্তমানে ভারতের নৌবাহিনীতে ৭,৪০০ টন ওজনের ‘বিশাখাপত্তনম’ ক্লাস ৪টি, ৭,৪০০ টন ওজনের ‘কলকাতা’ ক্লাস ৩টি, ৬,২০০ টন ওজনের ‘দিল্লী’ ক্লাস ৩টি এবং ৪,৯৭৪ টন ওজনের ‘রাজপুত’ ক্লাস ৩টি ডেস্ট্রয়ার ও গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার অপারেশনাল রয়েছে। তাছাড়া দেশটি ২০২২ সালে তাদের নৌবাহিনীতে ৪৫ হাজার টন ওজনের ডিজেল চালিত আইএনএস বিক্রান্ত এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার সার্ভিসে এনেছে।
এখানে প্রকাশ থাকে যে, বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের নেভাল ডকট্রিনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখন বিশাল আকারের যুদ্ধজাহাজের চাইতে অনেকটাই ছোট এবং মাঝারি আকারের ব্যাটল শিপের জন্য স্মার্ট ওয়েপন প্যাকেজ, দ্রুতগতি, সেন্সর, হাইলি স্টেলথনেস, ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ারকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। যদিও ডেস্ট্রয়ার জতীয় হেভি যুদ্ধজাহাজ এখনো পর্যন্ত সাগরের বুকে তার প্রভাব ও ফায়ার পাওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করে যাচ্ছে।#গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার, ডেইলি সাবাহ, উইকিপিডিয়া।

