সিরাজুর রহমান#
ইরান সম্প্রতি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি “সিমোর্ঘ” (Simorgh) নামের একটি লাইট সামরিক পরিবহন বিমানের সফল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই হালকা সামরিক পরিবহন বিমানের সর্বোচ্চ পে-লোড ক্যাপাসিটি বা বহনক্ষমতা প্রায় ৬ টন।
এই বিমানটি মূলত ডিজাইন ও নির্মাণ করেছে ইরান অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন (HESA)। ইরান প্রায় ১৫ বছরব্যাপী গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এই বিমানটি তৈরি করেছে। এতে ব্যবহৃত হয়েছে রাশিয়ার তৈরি দুটি শক্তিশালী Klimov TV3-117 টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন, যার প্রতিটির ক্ষমতা প্রায় ২,৫০০ হর্সপাওয়ার এবং এর সর্বোচ্চ টেক-অফ ওজন প্রায় ২১,৫০০ কেজি।
এই বিমানের আনুষ্ঠানিক ফ্লাইট টেস্ট শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে। এর আগে, ২০২২ সালের মে মাসে বিমানটির ফাস্ট ট্যাক্সি টেস্ট সম্পন্ন করা হয়। সাধারণত কোনো নতুন সিরিজ বা মডেলের বিমান উড্ডয়নের আগে নিজস্ব শক্তিতে রানওয়েতে উচ্চগতিতে চলাচলের সক্ষমতা যাচাই করা হয়ে থাকে।
সিমোর্ঘ বিমানের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ মিটার, ডানার বিস্তার ২৫ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৮ মিটার। এর সর্বোচ্চ পাল্লা (রেঞ্জ) প্রায় ৩,৯০০ কিলোমিটার, আর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৫০০–৫৩৩ কিলোমিটার। উড্ডয়নের জন্য এটি প্রায় ১,৪৫০ মিটার এবং অবতরণের জন্য প্রায় ৯০০ মিটার রানওয়ে প্রয়োজন হয়।
বিমানটিকে মাল্টি-রোল সামরিক মিশনের উপযোগী করে তুলতে এর পেছনে একটি হাইড্রোলিক কার্গো র্যাম্প যুক্ত করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ইরান গত দুই দশক ধরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমান ও সামরিক পরিবহন বিমান তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যদিও “সিমোর্ঘ” এখনো একটি প্রোটোটাইপ পর্যায়ে রয়েছে, তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত প্রায় ১০০ ঘণ্টার ফ্লাইট টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হলেই বিমানটি সিরিয়াল উৎপাদনের পথে এগিয়ে যাবে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিমানটির নকশা আংশিকভাবে ইউক্রেনের Antonov An-140 বিমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। উল্লেখ্য, ইরান পূর্বে এই বিমানের লাইসেন্সকৃত সংস্করণ IrAn-140 উৎপাদন করত। ইউক্রেনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইরানি প্রকৌশলীরা সেটির নকশা পরিবর্তন করে এটিকে একটি সামরিক পরিবহন বিমানে রূপান্তর করেন।
এই বিমান তৈরির মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক বাহিনীর এয়ার ফ্লিটে ব্যবহৃত পুরোনো C-130 Hercules এবং Fokker F-27 হালকা পরিবহন বিমানের বিকল্প হিসেবে প্রতিস্থাপন করা। এটি হালকা পণ্য, সৈন্য পরিবহন, পাশাপাশি প্রায় ২৪টি মেডিক্যাল স্ট্রেচার বহন করতে সক্ষম। এছাড়া ছোট, অপরিচ্ছন্ন বা অপ্রস্তুত রানওয়েতেও চলাচলের উপযোগী করে এটি ডিজাইন করা হয়েছে।
ইরানের কিছু সংবাদমাধ্যমে এই বিমানটির এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AWACS) সংস্করণ তৈরির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হলেও, আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকেরা এ দাবিকে এখনো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করছেন।
পরিশেষে বলা যায়, পশ্চিমা বিশ্বের শতাধিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ন্যানো টেকনোলজি, কমব্যাট ড্রোন, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং এখন সামরিক পরিবহন বিমান তৈরির মতো জটিল প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন ইরানকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: Wikipedia, Press TV, Aerospace Global News, WANA News, Army Recognition
-- বিজ্ঞাপন ---

