-- বিজ্ঞাপন ---

তেল থেকে তছনছ ভেনেজুয়েলা

কাজী আবুল মনসুর#

ভেনেজুয়েলা—একসময় লাতিন আমেরিকার ধনীতম দেশগুলোর একটি। বিশাল তেল মজুদ, সমৃদ্ধ কৃষি ও উষ্ণ রাজনৈতিক ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়ে মনে হতো দেশটি দারিদ্র্য ও সংকটের মুখোমুখি হবে না। কিন্তু ২০২৫–২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি প্রমাণ করে, সম্পদ থাকলেই দেশ সমৃদ্ধ হয় না; ভুল নীতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এক দেশকে ধ্বংস করতে পারে। তেল থেকে তছনছ এখন ভেনেজুয়েলা। তেলের অভিশাপে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ কীভাবে ধ্বংসের মুখে  গেল ভেনেজুয়েলা অন্যতম উদাহরণ।
খবর বেরয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এমন একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে মাদুরোকে চোখ বাঁধা এবং হাতকড়া পরে দেখা যাচ্ছে, এবং তিনি একটি মার্কিন নৌযান (USS Iwo Jima)‑তে আছেন। একই সাথে ভিডিও ফুটেজগুলোও প্রকাশ হয়েছে, মাঝে মধ্যে দেখা যায় তিনি নিউইর্কে পৌঁছেছেন এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রয়েছেন। এমনকি কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বলা হচ্ছে তিনি নির্দিষ্ট অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার ভক্ষণে নেওয়া হচ্ছে।
আসলে কি হচ্ছে? কেন যুক্তরাষ্ট্র এত এগ্রেসিভ?

ভেনেজুয়েলার ইতিহাস শুরু হয় স্প্যানিশ উপনিবেশ হিসেবে। ১৪৯৮ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস এ অঞ্চলে পৌঁছানোর পর স্পেন দেশটির দখল নেয়। পরবর্তী তিন শতাব্দী ধরে স্পেন এখানকার সম্পদ শোষণ করে এবং দাসপ্রথা চালু রাখে। ভেনেজুয়েলার সমস্যা শুরু হয়েছে ভুল অর্থনৈতিক মডেল ও দুর্নীতিপূর্ণ শাসন থেকে, আর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক চাপ সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে ভেনেজুয়েলায় বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করত। ১৪৯৮ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস উপকূলে পৌঁছান এরপর স্পেন দেশটি দখল করে নেয়,নাম “Venezuela” → অর্থাৎ “ছোট ভেনিস” (জলাভূমির ঘর দেখে নামকরণ)। স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা ছিলেন
সিমন বলিভার (লাতিন আমেরিকার কিংবদন্তি)। ১৮১১ সালে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে ভেনেজুয়েলা। বহু যুদ্ধের পর ১৮২৩ সালে স্পেন পুরোপুরি পরাজিত
ভেনেজুয়েলা স্বাধীন হলেও— যুদ্ধ দেশকে দারিদ্র্যে ফেলেছিল, ছিল না রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও। স্বাধীনতার পর প্রায় পুরো ১৯শ শতকজুড়ে সামরিক শাসন, অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ লেগেই ছিল। গণতন্ত্র আর হয়ে উঠেনি। ১৯২০-এর দশকে বিশাল তেল মজুদ আবিষ্কারের পর ভেনেজুয়েলা দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক হয় দেশে পরিনত হয়। দ্রুত শহরায়ণসহ মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটিতে পরিনত হয়। অর্থনীতি পুরোপুরি তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কৃষি ও শিল্পখাতকে অবহেলা করা হয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের পতন হলে গণতান্ত্রিক সরকার আসে। শিক্ষা ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ হলেও দুর্নীতি বাড়ে, তেলের টাকা কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়,গরিব–ধনী বৈষম্য তীব্র হয়। হুগো শাভেজ নির্বাচিত হন ১৯৯৯ সালে সমাজতান্ত্রিক নীতি গ্রহণ করেন। তিনি তেল শিল্প জাতীয়করণ করেন,গরিবদের জন্য শিক্ষা–স্বাস্থ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তিনি যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী নীতি গ্রহণ করেন। শুরুর দিকে গরিবরা উপকৃত হলে তার জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায় তখন দুর্নীতির আকার বাড়ে, রাষ্ট্রিয় প্রতিণ্ঠানগুলো দুর্বল হতে থাকে। ২০শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত—যুক্তরাষ্ট্র ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করত।ভেনেজুয়েলা ছিল “US-friendly” দেশ। সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক, এমনকি ঘনিষ্ঠ। হুগো শাভেজ আসার পর মোড় ঘুরে যায় ১৯৯৯ সালে শাভেজ ক্ষমতায় এসে—মার্কিন তেল কোম্পানির প্রভাব কমান। নিজেকে প্রকাশ্যে Anti-US নেতা হিসেবে তুলে ধরেন এবং বলেন—“ভেনেজুয়েলা আমেরিকার পেছনের উঠোন নয়।”এটাই ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধাক্কা। আসল ভয়টা কী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের? এখানে তিনটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ- তেল – ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের অন্যতম বড় তেল মজুদ, যুক্তরাষ্ট্র চায় তেল প্রবাহ তার নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবের বাইরে না যাক, আরেকটি সমাজতান্ত্রিক মডেল ছড়িয়ে পড়া যাতে শাভেজ অন্য লাতিন দেশগুলোকে অনুপ্রাণিত করছিল। ‘Anti-capitalist” ব্লক তৈরির চেষ্টা করা এবং কিউবা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়ার সঙ্গে জোট ছিল অন্যতম ভয়। লাতিন আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে নিজের প্রভাবক্ষেত্র মনে করে। রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাল সংকেত। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সেনা পাঠিয়ে না—বরং বহুমুখী চাপের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। ২০১৩ সালে হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। তার শাসনামলে তেলের দাম পতন, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে সংকট চরমে পৌঁছে। যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও সরকারি সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব পদক্ষেপ “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানবাধিকার রক্ষার” জন্য। তবে সমালোচকদের মতে, এসব নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি মাদুরো সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর একটি বড় কৌশল হিসেবে দেখা হয়।
তবে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। মাদুরো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকে, আর দেশটির রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়। একজন লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞের ভাষায়,“ভেনেজুয়েলা ভেঙে পড়েছে নিজের ভুলে, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি সেই পতনকে আরও দ্রুত করেছে।”
ভেনেজুয়েলায় সেনাবাহিনী শুধু নিরাপত্তা নয়, রাজনীতির অংশ। হুগো শাভেজ নিজেই ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। ক্ষমতায় এসে তিনি সেনাবাহিনীকে আদর্শগতভাবে “বলিভারিয়ান” বানান, উচ্চপদে রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের বসান, সেনাবাহিনীকে ব্যবসা, খাদ্য বিতরণ, তেল নিরাপত্তায় যুক্ত করেন। ফলে সেনাবাহিনী সরকার-নির্ভর হয়ে পড়ে।
বলতে গেলে, ভেনেজুয়েলার কোনো আলাদা সেনাবাহিনী নেই, তবে নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি একটি রাজনৈতিকভাবে অনুগত মিলিশিয়া রয়েছে—এবং পুরো সামরিক কাঠামো শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভেনেজুয়েলার যে সেনাবাহিনী (Bolivarian National Armed Forces) আছে তা চার শাখায় বিভক্ত: স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং ন্যাশনাল গার্ড। এছাড়া আছে রাজনৈতিকভাবে অনুগত Bolivarian Militia, যা সরকারকে সমর্থন দেয় এবং বিরোধী আন্দোলন দমন করতে ব্যবহার হয়। সেনাবাহিনী পুরোপুরি পেশাদার এবং নিরপেক্ষ নয়। এটি রাজনৈতিকভাবে সরকারের সঙ্গে যুক্ত। ভেনেজুয়েলার ঘটনা প্রমাণ করে—তেল সম্পদ থাকলেই দেশ সমৃদ্ধ হয় না। তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ দেশকে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলার জনসংখ্যা ২৮.৫ মিলিয়ন। খাদ্য ও ওষুধের অভাবে, লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে গেছে। শিশু অপুষ্টি, স্বাস্থ্য সংকট এবং অর্থনৈতিক ধ্বংস—এগুলো দেশের দৈনন্দিন বাস্তবতা। ভেনেজুেলার ইতিহাস শিক্ষা দেয়—সম্পদ থাকলেই দেশ উন্নত হয় না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক সরকার, বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি এবং ধারাবাহিক নীতি ছাড়া সমৃদ্ধি টেকসই হয় না।
ভেনেজুয়েলা দেখিয়েছে, তেল থাকলেও দুর্নীতি, রাজনৈতিক ভুল এবং আন্তর্জাতিক চাপ দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মানুষের ভরসা ও ধৈর্য এখনো পরীক্ষা হয়ে চলেছে, আর তেলের আবিষ্কার একসময় আশীর্বাদ হলেও বর্তমানে তা ভয়ঙ্কর অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় আয় ভেঙে পড়ে। সরকার অতিরিক্ত টাকা ছাপাতে শুরু করে, যার ফল হয় ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি।