সিরাজুর রহমান#
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবার মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব সম্ভবত তাদের আরেকটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে মোতায়েন করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর নিমিৎজ-ক্লাসের পারমাণবিক শক্তিচালিত সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার USS George H. W. Bush (CVN-77)–কে নতুন করে ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে মোতায়েন করা হতে পারে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের উপস্থিতি নির্দেশ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের সামরিক কৌশলে আমেরিকার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার দীর্ঘদিন ধরেই এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। সমুদ্রের মাঝখানে একটি ভাসমান বিমানঘাঁটির মতো কাজ করে এসব ক্যারিয়ার, যার মাধ্যমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চলেও দ্রুত এয়ার কমব্যাট মিশন পরিচালনা করা সম্ভব হয়। এই কারণে শক্তিশালী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বহরকে আধুনিক নৌ শক্তির অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে মোট ১১টি পারমাণবিক শক্তিচালিত সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার—এর মধ্যে ১০টি নিমিৎজ-ক্লাস এবং একটি জেরাল্ড আর ফোর্ড-ক্লাস (USS Gerald R. Ford)। প্রায় এক লক্ষ টনের বেশি ওজনের এই বিশাল ক্যারিয়ারগুলোতে CATOBAR (Catapult Assisted Take-Off But Arrested Recovery) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে ভারী যুদ্ধবিমানও সহজে উড্ডয়ন করতে পারে।
উল্লেখ্য, প্রায় ১২–১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত Gerald R. Ford-class ক্যারিয়ারকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি বর্তমানে আরব সাগর কিংবা গালফ অব ওমানে অবস্থান করছে। এর পাশাপাশি ইউএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে।
এই সুপার ক্যারিয়ারগুলোর পাশাপাশি মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে আরও ৮–৯টি অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ (LHD/LHA) রয়েছে, যেগুলো মূলত হেলিকপ্টার ও শর্ট-টেক-অফ যুদ্ধবিমান (যেমন F-35B) পরিচালনা করতে পারে। এগুলোও অনেক ক্ষেত্রে লাইট এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের মতো ভূমিকা পালন করতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের আর মাত্র একটি দেশ, ফ্রান্স, পারমাণবিক শক্তিচালিত এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পরিচালনা করে। তাদের ‘Charles de Gaulle’ ক্যারিয়ারটি ইউরোপের একমাত্র নিউক্লিয়ার-পাওয়ারড ক্যারিয়ার। অন্যদিকে চীন বর্তমানে তিনটি প্রচলিত জ্বালানিচালিত বা কনভেনশনাল পাওয়ারড এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পরিচালনা করছে, যদিও সেগুলো প্রচলিত জ্বালানিচালিত। রাশিয়ার একমাত্র ক্যারিয়ার Admiral Kuznetsov দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের কারণে কার্যত অপারেশনাল অবস্থায় নেই।
এদিকে যুক্তরাজ্য ও ভারতের নৌবাহিনী বর্তমানে দুটি করে অত্যাধুনিক কনভেনশনাল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পরিচালনা করছে। তুরস্ক সম্প্রতি TCG Anadolu নামের একটি বিশেষ লাইট ক্যারিয়ার সার্ভিসে এনেছে, যেটিকে ভবিষ্যতে ড্রোন-অপারেশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮–১০টি দেশ বিভিন্ন ধরনের এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পরিচালনা করলেও, সুপার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও বৈশ্বিক নৌ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যন্ত শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে আনুমানিক ৩,৭০০–৩,৮০০টির মতো যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও অন্যান্য এয়ারক্রাফট রয়েছে, যা তাদেরকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছে।##

