কাজী আবুল মনসুর#
“হরমুজ” নামটির উৎস ঐতিহাসিক। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ও দ্বীপ—‘হরমুজ দ্বীপ’ (Hormuz Island), যা বর্তমানে ইরানের অন্তর্গত। ঐতিহাসিকভাবে এই দ্বীপটি পারস্য উপসাগরীয় বাণিজ্যের একটি বড় কেন্দ্র ছিল এবং এখান থেকেই প্রণালীর নামকরণ হয় ‘হরমুজ প্রণালী’।অর্থাৎ, এটি কোনো আধুনিক রাজনৈতিক নাম নয়; বরং শতাব্দীপ্রাচীন বাণিজ্যিক ইতিহাস থেকেই ‘হরমুজ’ নামটির উৎপত্তি।
বিশ্ব মানচিত্রে আয়তনে ছোট হলেও অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বে হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী সামুদ্রিক জলপথগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ প্রণালী আজ বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু মানচিত্র নয়, বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ এই একটি প্রণালীর ওপর নির্ভর করছে বিশ্বের বড় একটি অংশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা।
হরমুজ প্রণালী অবস্থিত উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এটি পারস্য উপসাগরের একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশ ও বহির্গমন পথ। প্রণালীর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১৬০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ গড়ে ৫৫ থেকে ৯৫ কিলোমিটারের মধ্যে ওঠানামা করে। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে এটি মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত, যা একে সামুদ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি রুটে পরিণত করেছে।
এই প্রণালীর ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য নির্ধারিত দুটি আলাদা নাব্য চ্যানেল রয়েছে—একটি আগমন ও একটি বহির্গমন পথ। প্রতিটি চ্যানেলের কার্যকর প্রশস্ততা প্রায় দুই কিলোমিটার, যার মাঝখানে একটি বাফার জোন রাখা হয় নিরাপদ চলাচলের জন্য। হরমুজ প্রণালী অবস্থিত উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এটি পারস্য উপসাগরের একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশ ও বহির্গমন পথ। প্রণালীর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১৬০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ গড়ে ৩৩ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে ওঠানামা করে। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে এটি মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত, যা একে সামুদ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি রুটে পরিণত করেছে। বাস্তবে এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল দেশের সংখ্যা অনেক বেশি। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান—এই ছয়টি দেশ তাদের প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
এই দেশগুলো থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালী হয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানি হয়। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী শুধু দুই দেশের মধ্যকার একটি জলপথ নয়, বরং এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রপ্তানি ব্যবস্থার মূল শিরা। প্রতিদিন শত শত তেলবাহী ট্যাংকার, গ্যাসবাহী এলএনজি ক্যারিয়ার ও বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। পারস্য উপসাগরের অভ্যন্তরে অবস্থিত বন্দরগুলো থেকে জাহাজগুলো প্রথমে এই প্রণালীতে প্রবেশ করে, এরপর ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে পৌঁছে আন্তর্জাতিক রুটে যুক্ত হয়।
এই জলপথই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর একমাত্র বড় সামুদ্রিক বহির্গমন পথ হওয়ায় এখানে জাহাজ চলাচল প্রায় সারাবছরই অত্যন্ত ঘন। আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও নৌ নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে এই পথ দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল পরিচালিত হয়।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ থেকে ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট দৈনিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০–২৫ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশাল পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন, বিশেষ করে কাতার থেকে রপ্তানিকৃত গ্যাস। ফলে এই একটি প্রণালীর ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বের একটি বড় অংশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
হরমুজ প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতার খবর পেলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ, খাদ্যপণ্যের মূল্য এবং সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিতে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে, কারণ তাদের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশাল পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন। ফলে এই একটি প্রণালীর ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বের একটি বড় অংশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
ভৌগোলিকভাবে প্রণালীর উত্তরাংশ ইরানের জলসীমার মধ্যে এবং দক্ষিণাংশ ওমানের জলসীমার মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে স্বীকৃত, ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা আইনগতভাবে বৈধ নয়। তবে বাস্তবতায় সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইরান এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি এই অঞ্চলে নৌবাহিনী মোতায়েন রেখে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালী আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ও গভীর প্রভাব পড়বে। প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যেতে পারে।
এর ফলে পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, খাদ্য উৎপাদন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। অনেক দেশ বিকল্প রুট হিসেবে পাইপলাইন ব্যবস্থার কথা বললেও সেই সক্ষমতা হরমুজ প্রণালীর সমপর্যায়ের নয়। অর্থাৎ বাস্তবিক অর্থে এই প্রণালীর পূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বে নেই।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চলের একটি। ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলে নৌ উপস্থিতি বেড়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, জাহাজ চলাচলে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যদিও এখনো প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি, তবে চলমান উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্থায়ী এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে রেখেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রণালীর নাম আবারও বিশ্ব সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে। এটি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়—এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি কৌশলগত সুইচ। এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভর করে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা।
হরমুজ প্রণালী আজ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়—এটি বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসনালী, যার স্থিতিশীলতা মানেই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, আর অস্থিরতা মানেই বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা। হরমুজ প্রণালী কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়—এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি কৌশলগত সুইচ। এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভর করে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা।#

