-- বিজ্ঞাপন ---

নিউক্লিয়ার সাবমেরিন ও বিশ্ব নিরাপত্তা: সমুদ্রের নিচে নীরব যুদ্ধ

সিরাজুর রহমান#

এক অজানা যুদ্ধের আশঙ্কায় নীরবে প্রস্তুত হচ্ছে বিশ্বের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন। সমুদ্রের গভীরে নিঃশব্দে চলাচল করছে এমন সব যুদ্ধযান, যাদের উপস্থিতিই বদলে দিতে পারে একটি যুদ্ধের পরিণতি—এগুলোই নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন। প্রকাশ্যে খুব কম আলোচনায় এলেও, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে এগুলোই সবচেয়ে ভয়ংকর ও কৌশলগত অস্ত্রব্যবস্থার অন্যতম। বর্তমান ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সাবমেরিনগুলো যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের প্রস্তুতিতে নীরবে অবস্থান করছে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪১টি দেশের নৌবাহিনী বিভিন্ন ধরনের সাবমেরিন ব্যবহার করলেও, নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিউক্লিয়ার শক্তিচালিত সাবমেরিন পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ৬টি দেশের হাতে। দেশগুলো হলো— যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও ভারত।
এই ছয় দেশের মধ্যে আবার একটি স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সাবমেরিন ফ্লিটের শতভাগই নিউক্লিয়ার শক্তিচালিত, অর্থাৎ তারা আর কোনো ডিজেল–ইলেকট্রিক সাবমেরিন ব্যবহার করে না। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন ও ভারতের নৌবাহিনীতে নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের পাশাপাশি এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডিজেল–ইলেকট্রিক সাবমেরিন সক্রিয় রয়েছে।
ওপেন–সোর্স বিশ্লেষণ ও স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪৫ থেকে ১৫০টি নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন অপারেশনাল বা আংশিকভাবে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবে এই বিশাল বহরের মধ্যেও প্রকৃত অর্থে কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন সাবমেরিনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

এই মোট সংখ্যার মধ্যে মাত্র প্রায় ৪০টি সাবমেরিন হলো SSBN (Submarine-Launched Ballistic Missile Submarine)—যেগুলো পারমাণবিক ওয়ারহেডবাহী ব্যালেস্টিক মিসাইল বহনে সক্ষম। এই শ্রেণির সাবমেরিনগুলোই মূলত একটি দেশের দ্বিতীয় আঘাত (Second Strike Capability) নিশ্চিত করে এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ নীতির (Nuclear Deterrence) মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী হিসেবে পরিচিত ইউএস নেভি বর্তমানে আনুমানিক ৬৬–৭১টি নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে আক্রমণাত্মক সাবমেরিন (SSN), গাইডেড মিসাইল সাবমেরিন (SSGN) এবং কৌশলগত SSBN।
রাশিয়ার নৌবাহিনীতে সক্রিয় নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের সংখ্যা প্রায় ৩৫টি। যদিও সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম, তবে রাশিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরেই–ক্লাস (Borei-class) ও ইয়াসেন–ক্লাস (Yasen-class) সাবমেরিনের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা দ্রুত আধুনিকায়ন করছে।
চীনের হাতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫–১৭টি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬টি কৌশলগত SSBN সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীতে প্রায় ১০টি, ফ্রান্সের ৯–১০টি, এবং ভারতের হাতে বর্তমানে ২টি নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন রয়েছে—যার একটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে।
SIPRI–এর তথ্যমতে, রাশিয়ার নৌবহরে বর্তমানে ১২টি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম সাবমেরিনে প্রায় ১৯২টি দীর্ঘপাল্লার নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডবাহী ব্যালেস্টিক মিসাইল মোতায়েন রয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ১৪টি কৌশলগত সাবমেরিনে আনুমানিক ২৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেডবাহী ব্যালেস্টিক মিসাইল মোতায়েন করেছে। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয়—স্থল বা আকাশ নয়, বরং সমুদ্রের গভীরতাই এখন পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঘাঁটি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীনের পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতার দ্রুত আধুনিকায়ন পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগর ও আর্কটিক অঞ্চলে এই সাবমেরিন কার্যক্রম বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
তবে বাস্তবতা হলো—এই প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হোক না কেন, নিউক্লিয়ার সাবমেরিন মূলত সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে যুদ্ধ ঠেকানোর হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই বিষয়টিকে আতঙ্ক নয়, বরং বিশ্বশান্তি, কৌশলগত ভারসাম্য ও পারমাণবিক প্রতিরোধ নীতির আলোকে বিশ্লেষণ করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।#

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আর্ক্টিক টুডে, তাস, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)