হাইপারসনিক মিসাইলের যুদ্ধক্ষেত্রে অভিষেক:ইরান–রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা
সিরাজুর রহমান##
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র সারা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে৷ আর এখন ইরানে আমেরিকার সামরিক হামলার হুমকির কারণে নতুন করে আবারও হাইপারসনিক মিসাইলের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি যুদ্ধ পরীক্ষিত হাইপারসনিক মিসাইল ভান্ডার আমেরিকার মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
আসলে হাইপারসনিক মিসাইল প্রতিযোগিতায় বার বার আমেরিকা এবং চীনসহ ৬টি দেশের নাম আসলেও বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত এই অভাবনীয় অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে মাত্র দুটি দেশ। আর দেশ দুটি হচ্ছে রাশিয়া এবং ইরান। যদিও এই প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গবেষণায় বিগত এক দশকে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন।
তবে, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের দিক দিয়ে রাশিয়া ইতোমধ্যেই তার হাইপারসনিক (কিনঝান, জিরকন) মিসাইল ইউক্রেনের উপর নিক্ষেপ করেছে। যা পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দ্বারা ইন্টারসেপ্ট বা প্রতিহত করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেছে। অন্যদিকে গত ২০২৫ সালের মে মাসে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সফলভাবে হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার করেছে।
বিশেষ করে ইসরাইল, আমেরিকা এবং আরব দেশগুলোর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের বাধা অতিক্রম করে ইরানের ফাতাহ-১/২ সিরিজের ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জের হাইপারসনিক মিসাইলগুলো সুনির্দিষ্ট টার্গেটে আঘাত হানে। ফাতাহ সিরিজের হাইপারসনিক মিসালের রেঞ্জ হলো প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার এবং গতি আনুমানিক ম্যাক ১৩ বা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার।
এদিকে গত ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া তার নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি অত্যাধুনিক ৯ ম্যাক গতি সম্পন্ন এয়ার লঞ্চড বেসড কেএইচ-৪৭এম২ (কিনঝাল) এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে ‘জিরকন’ হাইপারসনিক মিসাইল নিক্ষেপ করে সারা বিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এসব মিসাইলের গতি ছিল কিনা অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ম্যাক ৯ বা ১১,১৮৩ কিলোমিটার।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রথম দিকে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ক্যাপবল এই জাতীয় উচ্চ গতির ‘কিনঝান’ এবং ‘জিরিকন’ হাইপারসনিক মিসাইলকে রাশিয়ার ‘ডুমসডে ওয়েপনস’ বা ‘ধ্বংসের অস্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করে, যদিও বাস্তবে ইউক্রেন যুদ্ধে পরবর্তীতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে ব্যার্থ হয় বলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
অন্যদিকে, চীন তৈরি করেছে নিজস্ব প্রযুক্তির ডিএফ-১৭ হাইপারসনিক মিসাইল, যা ম্যাক ৫-১০ গতির DF-ZF গ্লাইড ভেহিকল ব্যবহার করে বলে দাবি করা হয়। আবার প্রায় ম্যাক ৬ গতির ক্যারিয়ার কিলার খ্যাত ওয়াইজে-২১ এন্টিশিপ মিসাইল, যা শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানতে পারে। এর পাশাপাশি একটি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহনে সক্ষম Jinglei-1 (JL-1) হাইপারসনিক মিসাইল তৈরি করেছে চীন।
তবে, বিশ্বের এক নম্বর সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে হাইপারসনিক গ্লাইড বডি (সি-এইচজিবি) সিস্টেম। যার গতি হবে কিনা অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ১৭.০ ম্যাক বা তার কাছাকাছি। যদিও আমেরিকার সামরিক বাহিনীর এই প্রযুক্তি অর্জনে বিনিয়োগের বিপরীতে বাস্তব সাফল্য হয়ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে।
গত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পেন্টাগন’ জানায় যে, ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে “ডার্ক ঈগল” নামে পরিচিত লং-রেঞ্জ হাইপারসনিক ওয়েপন (LRHW) সিস্টেমের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এটি ছিল আসলেগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সফলতার পর দেশটির দ্বিতীয় সফল পরীক্ষা।
তাছাড়া ইউএস এয়ারফোর্স বর্তমানে লকহিড মার্টিন কর্পোরেশনের তৈরি নতুন প্রজন্মের এজিএম-১৮৩এ এয়ার লঞ্চড বেসড হাইপারসনিক মিসাইল নিয়ে কাজ করছে। যদিও গত ২০২৩ সালের মার্চ মাসে প্রোগ্রামটি বাতিল করা হয়েছিল একাধিক ব্যর্থতার কারণে। যদিও এই প্রজেক্ট পরে আবারও চালু করেছে ইউএস এয়ারফোর্স।
পরিশেষে বলা যায়, এই অতি উচ্চ প্রযুক্তির হাইপারসনিক গতির মিসাইল সিস্টেম ডিজাইন এণ্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের পাশাপাশি ইরান, ভারত এবং উত্তর কোরিয়া অনেকটাই এগিয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে একেবারেই প্রথম রাশিয়া ও ইরান এই জাতীয় অস্ত্রের প্রয়োগ করে হয়ত বিশ্বকে নতুন এক হাইপারসনিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।#

