-- বিজ্ঞাপন ---

মহাকাশে টমেটো চাষ: Tiangong Space Station-এ পাকা লাল ফল

কাজী আবুল মনসুর#

মহাকাশে টমেটো! শুনতে যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কোনো দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবেই পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার ওপরে, নীরব মহাশূন্যের ভেতরে মানুষের তৈরি একটি স্টেশনের ভেতর জন্ম নিচ্ছে লাল টমেটো। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল হিসেবে এবার সেই গাছ থেকেই প্রথমবারের মতো টমেটো তুলেছেন মহাকাশচারীরা। চীনের মহাকাশ স্টেশন Tiangong Space Station-এর তিয়ানগং‑এ “স্পেস টমেটো” সহজেই বাস্তবে পরিণত হয়েছে! ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি ১৮ তারিখে, মহাকাশচারীরা সেখানে একটি এ্যারোপোনিক সিস্টেমে চাষ করা টমেটো গাছ থেকে পাকা টমেটো সংগ্রহ করেছেন এবং এটি সংবাদে প্রচারিত হয়েছে।
মহাকাশচারীরা ভিডিওতে দেখিয়েছেন কিভাবে “স্পেস ভেজিটেবল গার্ডেন”‑এর টমেটো গাছে লাল ফল ঝুলছে, এবং তারা প্রতিদিন তাজা ফলের গন্ধ উপভোগ করছেন। এই সাফল্য চীনের Shenzhou‑21 মিশনের অঙ্গ হিসেবে এসেছে, এবং এটি মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশে ফল উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করছে।
পৃথিবীর মাটি ছেড়ে মহাকাশে খাদ্য উৎপাদনের এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছে চীনের মহাকাশ স্টেশন Tiangong Space Station-এ। সেখানে থাকা মহাকাশচারীরা একটি ছোট্ট কৃত্রিম বাগানে টমেটো গাছের পরিচর্যা করছিলেন। মাইক্রোগ্রাভিটি—অর্থাৎ প্রায় শূন্য মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে গাছ বড় করা নিজেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। তবু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে আধুনিক বিজ্ঞান।
মহাকাশে তো মাটি নেই, বৃষ্টি নেই, বাতাস নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন একেবারে ভিন্ন প্রযুক্তি। গাছের শিকড় মাটির বদলে থাকে একটি বিশেষ চেম্বারের ভেতরে, যেখানে পুষ্টিসমৃদ্ধ তরল কণার মতো স্প্রে করা হয়। সূর্যের আলো না থাকায় গাছের ওপর পড়ে বেগুনি আভাযুক্ত বিশেষ LED আলো। সেই আলোতেই ধীরে ধীরে বড় হয় গাছ, ফোটে ফুল, আর একসময় ঝুলে ওঠে ছোট ছোট টমেটো।
মহাকাশচারীরা জানান, যখন প্রথম পাকা টমেটোটি গাছ থেকে তুললেন, মুহূর্তটি ছিল সত্যিই অবিশ্বাস্য। পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে, জানালার বাইরে অসীম মহাশূন্য আর নীল পৃথিবী ঘুরছে—আর ভেতরে মানুষের হাতে ধরা একেবারে তাজা একটি টমেটো!
এ ধরনের গবেষণা শুধু কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়। ভবিষ্যতে মানুষ যদি চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহে দীর্ঘ সময় থাকে, তাহলে পৃথিবী থেকে প্রতিনিয়ত খাবার পাঠানো সম্ভব হবে না। তাই মহাকাশেই খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা তৈরি করা এখন বিজ্ঞানীদের বড় লক্ষ্য।
এ ধরনের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা NASA-ও বহুদিন ধরে কাজ করছে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা International Space Station-এ ইতিমধ্যেই লেটুস, মরিচ এবং ছোট টমেটো চাষের পরীক্ষা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশে গাছ চাষ করা গেলে শুধু খাবারই পাওয়া যাবে না—গাছ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেনও তৈরি করবে, যা মহাকাশচারীদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দীর্ঘদিন মহাকাশে থাকা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও সবুজ গাছপালা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মহাকাশে টমেটো চাষের বর্তমান পরীক্ষাটি শুরু হয় মূলত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সেই সময় একটি বিশেষ উদ্ভিদ চাষের যন্ত্র চীনের কার্গো মহাকাশযানের মাধ্যমে পাঠানো হয় চীনের মহাকাশ স্টেশন Tiangong Space Station-এ। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই যন্ত্রটি মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে যায়।
এটি ছিল একটি আধুনিক aeroponic cultivation system, যেখানে মাটি ছাড়াই গাছ বড় করা যায়। যন্ত্রটি তৈরি করেছে চীনের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান China Astronaut Research and Training Center।
স্টেশনে পৌঁছানোর পর মহাকাশচারীরা পরীক্ষামূলকভাবে টমেটোর বীজ রোপণ করেন। এরপর প্রতিদিন গাছের বৃদ্ধি, পাতা, ফুল ও ফলের পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কয়েক মাসের পরিচর্যার পর ২০২৬ সালের শুরুতে গাছগুলোতে ফল ধরতে শুরু করে। অবশেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহাকাশচারীরা গাছ থেকে পাকা টমেটো সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
সেই সময় চীনের নববর্ষ উৎসব চলছিল, আর মহাকাশচারীরা এটিকে বলেছিলেন তাদের “মহাকাশের ছোট্ট সবজি বাগানের উপহার”।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশে টমেটো চাষের এই সাফল্য ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশ মহাকাশে স্বয়ংসম্পূর্ণ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গবেষণা চালাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে মানুষ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য চাঁদ কিংবা মঙ্গল গ্রহে বসবাস শুরু করে, তাহলে সেখানে খাদ্য উৎপাদনের জন্য ছোট আকারের স্পেস গ্রিনহাউস বা মহাকাশ কৃষি কেন্দ্র গড়ে তোলা হতে পারে।
এ ধরনের গ্রিনহাউসে আধুনিক হাইড্রোপনিক্স ও অ্যারোপনিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটি ছাড়াই সবজি ও ফল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে মহাকাশচারীরা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবারের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবেন।
এ গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবনধারণের পরিবেশ তৈরি করা। গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারে, যা মহাকাশ স্টেশন বা ভবিষ্যতের মহাকাশ বসতিতে মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এ কারণে বিশ্বের বড় মহাকাশ সংস্থাগুলো—যেমন NASA, China National Space Administration এবং European Space Agency—মহাকাশে কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে মহাকাশ স্টেশনগুলোতে নিয়মিত সবজি চাষ করা সম্ভব হবে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ মিশনে মহাকাশচারীরা নিজেদের জন্য তাজা খাবার উৎপাদন করতে পারবেন।
এক সময় যে মহাকাশকে মনে করা হতো সম্পূর্ণ প্রাণহীন এক অন্ধকার শূন্যতা—আজ সেখানে জন্ম নিচ্ছে সবুজ গাছ, আর পাকছে লাল টমেটো। বিজ্ঞানীদের মতে, এ দৃশ্য হয়তো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত—একদিন মানুষ পৃথিবীর বাইরেও নিজের খাবার নিজেই উৎপাদন করবে।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, মহাকাশে টমেটো চাষের এই সাফল্য হয়তো একদিন এমন একটি যুগের সূচনা করবে, যখন মানুষ শুধু পৃথিবীতেই নয়—বরং মহাকাশের অন্য গ্রহেও কৃষি করতে পারবে।