বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার#
একটি আনন্দভ্রমণ, সমুদ্রের কাছে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটানোর প্রত্যাশা, তারপর হঠাৎ আগুন, সবকিছু শেষ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তে। কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালেন ১০ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণী, শিশু। তাঁদের কারও সামনে ছিল দীর্ঘ ভবিষ্যৎ, কারও অপেক্ষায় ছিল পরিবারের ভালোবাসাভরা ঘর। কিন্তু আনন্দের সফর শেষে তাঁদের আর বাড়ি ফেরা হলো না।
কক্সবাজারে যাওয়ার সময় তাঁদের চোখে নিশ্চয়ই ছিল অন্য রকম এক আনন্দের ছবি। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি, ঢেউয়ের গর্জন, নীল আকাশের নিচে প্রিয়জনদের সঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটানো, সব মিলিয়ে হয়তো ছিল এক টুকরো প্রশান্তির প্রত্যাশা। ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে একটু নিঃশ্বাস নেওয়া, একসঙ্গে হাসি-আড্ডায় সময় কাটানো, ফিরে এসে প্রিয় মানুষদের কাছে ভ্রমণের গল্প শোনানো, এমন কত সাধারণ অথচ মূল্যবান স্বপ্ন নিয়েই তো মানুষ ঘর থেকে বের হয়। কিন্তু কে জানত, সেই আনন্দভ্রমণই কারও জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে? কে জানত, যে মানুষগুলো সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়েছিলেন, তাঁদের কারও কারও জীবনের শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে আগুনের ভয়াবহতা? যে বাড়িতে ফেরার কথা ছিল হাসিমুখে, সেই বাড়িতেই ফিরতে হবে নিথর দেহ হয়ে, এমন নির্মম পরিণতির কথা কি কেউ কল্পনাও করেছিলেন?
১৭ অক্টোবর, শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সকাল আনুমানিক ৭টা ২৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রিসোর্টের কাঠের কাঠামোয়। একপর্যায়ে আনন্দভ্রমণের জায়গাটি পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উদ্ধারকাজ শেষে ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আহতদেরও হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে, ঠিক কত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ভেতরে থাকা সবাই নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না,এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এই মৃত্যুর খবরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় তরুণ শিক্ষার্থীদের অকালে ঝরে পড়ার ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিজ তেহামীও প্রাণ হারিয়েছেন এই অগ্নিকাণ্ডে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন মানেই নতুন পৃথিবীকে জানার আগ্রহ, নিজের যোগ্যতা গড়ে তোলা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা। ভাষা শেখার মধ্য দিয়ে অন্য সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, নাফিজের শিক্ষাজীবনেও তেমন সম্ভাবনার দরজা খোলা ছিল। কিন্তু সেই পথচলা আর এগিয়ে নেওয়া হলো না। তাঁর পরিবারের জন্য এটি শুধু একজন সন্তানকে হারানোর শোক নয়; এটি এমন এক ভবিষ্যৎ হারানোর বেদনা, যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য আশা, প্রত্যাশা ও ভালোবাসা।
নিহতদের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলার নামও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ঘটনায় পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৩ বছর বয়সী মেলিতা মেহেজাবিন আলভির নামও এসেছে সংবাদ প্রতিবেদনে। নিহতদের তালিকায় পাঁচ বছর বয়সী শিশু ফাইজান আহমেদের নাম রয়েছে। একটি শিশুর জীবন তো সবে শুরু হয়েছিল,পৃথিবীকে চেনা, নতুন শব্দ শেখা, পরিবারের হাত ধরে বড় হয়ে ওঠা, একদিন নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখা—সবকিছুই ছিল সামনে। অথচ সেই শৈশবও রক্ষা পেল না আগুনের ভয়াবহতা থেকে।
একটি পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যু এই ঘটনাকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে। স্বজনদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচে যান বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কল্পনা করা যায়, আগুন ছড়িয়ে পড়ার সেই মুহূর্তে তাঁদের মনে কী ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল? যে মানুষগুলো কিছুক্ষণ আগেও একসঙ্গে ছিলেন, তাঁদের কেউ হয়তো অন্য কাউকে খুঁজেছেন, কেউ বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজেছেন, কেউ হয়তো প্রিয়জনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তগুলোর প্রকৃত বিবরণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। যা জানা গেছে, তা-ই যথেষ্ট হৃদয়বিদারক,একটি পরিবারের আনন্দভ্রমণ মুহূর্তে পরিণত হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতিতে।
পরিবারের সদস্যদের হারানোর শোক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানে শুধু একটি জীবন থেমে যাওয়া নয়; তাঁর বাবা-মায়ের প্রত্যাশা, ভাইবোনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া স্মৃতি, বন্ধুবান্ধবের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সাজানো পরিকল্পনারও এক নির্মম সমাপ্তি। আর যখন একই দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারান, তখন সেই শোকের গভীরতা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। যে বাড়িতে ফিরে তাঁদের ভ্রমণের গল্প শোনানোর কথা ছিল, সেখানে এখন হয়তো অপেক্ষা করছে নিস্তব্ধতা, কান্না আর বিশ্বাস করতে না পারার এক অসহায় বাস্তবতা।
কিন্তু এই ঘটনা কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে? এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি চালু ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যদি আগে থেকেই অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়ে থাকে, তবে সেই সতর্কতার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না? পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত ভবনে আগুন লাগলে তাঁদের দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না? এসব প্রশ্নের জবাব এখন অত্যন্ত জরুরি।
রিসোর্টটির কাঠের কাঠামো আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাতের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে ভবনের নকশা, জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কারণ, অগ্নিকাণ্ডের পর শুধু আগুন কীভাবে লাগল তা জানলেই হবে না; আগুন লাগার পর মানুষ কেন নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারলেন না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে সেখানে বেড়াতে যান। তাঁদের প্রত্যাশা থাকে নিরাপদে সময় কাটানো এবং সুস্থভাবে বাড়ি ফেরা। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যেমন মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে, তেমনি পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি রিসোর্টে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সাধারণ পর্যটক হয়তো ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, জরুরি নির্গমনপথ কিংবা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে পারেন না। এসব নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের ওপরই বর্তায়।
তাই এই অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পর্যটন এলাকায় অন্য রিসোর্ট ও হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, নিয়মিত পরিদর্শন হয় কি না, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়,এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার পরও যদি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই সেটি চালু থাকে, তবে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তদন্তে অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী দায় নির্ধারণ করতে হবে।
সমুদ্রের ঢেউ হয়তো আগের মতোই আছড়ে পড়বে কক্সবাজারের সৈকতে। পর্যটকেরা আবার আসবেন, রিসোর্টগুলোতে আবার আলো জ্বলবে, আনন্দে মুখর হবে অবকাশযাপনকেন্দ্রগুলো। কিন্তু যেসব পরিবার প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের জীবনে সেই আগের আনন্দ আর কখনোই ফিরে আসবে না। নাফিজ তেহামী আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ফিরবেন না। লায়লা জাহান নাবিলার জীবনও থেমে গেছে। যে শিশুটি আরও কত কিছু শেখার কথা ছিল, সেই ফাইজানও আর কোনো দিন পরিবারের হাত ধরে সমুদ্র দেখতে যাবে না। তাঁদের স্বজনদের কাছে এই ক্ষতি কোনো সাময়িক দুঃসংবাদ নয়; এটি আজীবন বয়ে বেড়ানোর এক শূন্যতা।
আনন্দ করতে গিয়ে মানুষ যেন মৃত্যুর মুখোমুখি না হন,এটাই হওয়া উচিত এই ঘটনার পর আমাদের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি। পর্যটন মানে শুধু সুন্দর সৈকত, ঝলমলে আলো, আরামদায়ক কক্ষ কিংবা আকর্ষণীয় খাবার নয়; পর্যটন মানে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও। যে মানুষটি পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে বের হন, তাঁর নিরাপদে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। যে শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, তাঁর জীবন রক্ষার দায়িত্বও সমাজ ও রাষ্ট্রের।
কক্সবাজারের এই আগুনে ১০টি প্রাণ ঝরে গেছে। তাঁদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু যদি অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর করার, নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করার এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে নিরাপদ করার কার্যকর উদ্যোগের সূচনা ঘটায়, তবে ভবিষ্যতে আরও অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। এখন প্রয়োজন শোকের পাশাপাশি সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ, আনন্দভ্রমণে বেরিয়ে কোনো মানুষ যেন আর লাশ হয়ে বাড়ি না ফেরেন,এই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি মানুষের জীবনের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা।#

